রায়গঞ্জে ভয়াবহ আগুনে পুড়ল ৭ দোকান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ বার
রায়গঞ্জে ভয়াবহ আগুনে পুড়ল ৭ দোকান

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার নিমগাছি বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাতটি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সোমবার ভোররাতে বাজারের তিন রাস্তার মোড় এলাকায় হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হলে মুহূর্তের মধ্যে তা আশপাশের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের প্রাণপণ চেষ্টা এবং পরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিটের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সাত ব্যবসায়ীর স্বপ্ন ও জীবিকার বড় অংশ পুড়ে যায়।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ওই বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। কারও কারও ব্যবসা ছিল পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, বছরের পর বছর পরিশ্রম করে গড়ে তোলা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মুহূর্তের মধ্যে আগুনে ভস্মীভূত হওয়ায় তারা এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দিবাগত রাতের কোনো এক সময় নিমগাছি বাজারের একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথমে আগুন সীমিত এলাকায় থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বাজারের দোকানগুলো কাছাকাছি অবস্থানে থাকায় আগুন দ্রুত এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছড়িয়ে পড়ে।

রাতের নীরবতা ভেঙে আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্থানীয়রা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন এবং দোকানগুলো থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু আগুনের তীব্রতা দ্রুত বাড়তে থাকায় তাদের চেষ্টা যথেষ্ট ছিল না।

একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে তাড়াশ ও রায়গঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং আশপাশের আরও দোকান ও স্থাপনায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমে যায়।

ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে বড় ধরনের আরও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই বাজারের সাতটি দোকান এবং সেখানে থাকা বিপুল পরিমাণ মালামাল সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছেন নিমগাছি গ্রামের সোলেমান তালুকদার, চণ্ডিভোগ গ্রামের মো. হায়দার আলী, দিগেন্দ্রনাথ সরকার, সাধন কুমার সরকার ও ক্ষুদিরাম সরকার। এছাড়া বিষমডাঙ্গা গ্রামের আতাউর এবং পুল্লা গ্রামের আব্দুলার দোকানও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর মধ্যে ছিল ওষুধের দোকান, পান-সিগারেটের দোকান, ফলের দোকান এবং স্বর্ণকারের দোকান। বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় দোকানভেদে পুড়ে যাওয়া মালামালের ধরনও ছিল ভিন্ন। কোথাও ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, কোথাও খাদ্যপণ্য, আবার কোথাও ব্যবসার মূল্যবান উপকরণ আগুনে নষ্ট হয়ে গেছে।

আগুনের পর সোমবার সকালে বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া দোকানগুলোর চারপাশে ভিড় করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন, আবার কেউ পুড়ে যাওয়া দোকানের ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকিয়ে ক্ষয়ক্ষতির কথা আলোচনা করছেন। ব্যবসায়ীদের অনেকেই পোড়া দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অবশিষ্ট কোনো মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব কি না, তা খুঁজে দেখেন।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, তাদের অনেকেরই ব্যবসার পেছনে বছরের পর বছর শ্রম ও সঞ্চয় জড়িয়ে আছে। কেউ কেউ ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। হঠাৎ আগুনে সবকিছু হারিয়ে তারা এখন নতুন করে ব্যবসা শুরু করার সামর্থ্য নিয়ে চিন্তিত।

তাদের মতে, একটি দোকান শুধু ব্যবসার জায়গা নয়, এর সঙ্গে একটি পরিবারের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে থাকে। প্রতিদিনের বিক্রির অর্থ দিয়েই অনেক ব্যবসায়ী সংসার চালান, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ দেন এবং পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটান। তাই কয়েক ঘণ্টার আগুন তাদের জন্য শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আবার ব্যবসা শুরু করতে সহায়তা না পেলে অনেক পরিবার দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে পারে।

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে আগুনের সঠিক কারণ নির্ধারণের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

তাড়াশ ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মুহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আগে অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও জানান, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী সাতটি দোকান পুড়ে প্রায় ৮ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মালামালের প্রকৃত মূল্য এবং মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বিস্তারিত যাচাইয়ের পর পরিবর্তিত হতে পারে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায়ই ছোট ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাজার এলাকায় দোকানগুলো ঘনবসতিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠা, পুরোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ, অতিরিক্ত তারের ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা অনেক সময় ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে বাজার এলাকায় বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারাও মনে করছেন, শুধু দুর্ঘটনার পর ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করলেই যথেষ্ট নয়, আগুন প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাজারের বৈদ্যুতিক লাইন নিয়মিত পরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ অপসারণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত আগুন নেভানোর ব্যবস্থা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

নিমগাছি বাজারের এই অগ্নিকাণ্ডে এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন ক্ষতিগ্রস্ত সাত ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবার। পুড়ে যাওয়া দোকানের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার চিন্তাই এখন তাদের প্রধান উদ্বেগ। ব্যবসা পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন হবে অর্থ, সময় এবং সহায়তা।

স্থানীয়দের আশা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে প্রশাসন ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে আসবেন। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের কারণ তদন্ত করে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাতের একটি আকস্মিক আগুন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাতটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। তবে ধ্বংসের মধ্যেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, সহযোগিতা পেলে তারা আবারও দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবন ও ব্যবসা নতুন করে গড়ে তুলতে পারবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত