অতীতে আটকে থাকলে উন্নয়ন থেমে যাবে: ভারতীয় হাইকমিশনার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
অতীতে আটকে থাকলে উন্নয়ন থেমে যাবে: ভারতীয় হাইকমিশনার

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে অতীতের বিষয়গুলোকে স্বীকার করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেছেন, অতীতকে ভোলা সম্ভব নয়, তবে অতীতে আটকে থাকলে কোনো দেশই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে না। প্রতিবেশী দুই দেশের মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ইতিবাচক পর্যায়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান ভারতীয় হাইকমিশনার।

দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে প্রতিবেশী হিসেবে উভয় দেশের দায়িত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে মতপার্থক্য থাকলেও সাধারণ মানুষের স্বার্থে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য বা ফ্রি ট্রেডের সম্ভাবনা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশেরই নিজস্ব অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে পারস্পরিক বাণিজ্য আরও সহজ, কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিধি দীর্ঘদিন ধরেই বিস্তৃত। বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত অবকাঠামো এবং মানুষের চলাচলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও বাণিজ্য সম্পর্কের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে দুই দেশের কর্মকর্তাদের আলোচনায় ভারতীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ, স্থলবন্দরগুলোকে আরও কার্যকর করা এবং সীমান্ত হাট পুনরায় চালুর মতো বিষয় উঠে আসে। ফলে নতুন করে মুক্ত বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ভবিষ্যৎমুখী অবস্থানের বার্তাও পাওয়া যায়। তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা দুই দেশের সম্পর্ক বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও সহযোগিতার পথে এগিয়ে যেতে হলে বর্তমান বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশে নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারতীয় হাইকমিশনার দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক ও গঠনমূলক পর্যায়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, অর্থনীতি, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তিনি ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও রাজনীতিক। ভারতীয় সরকার তাকে ঢাকায় দেশটির ১৬তম হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে তার নিয়োগকে ভিন্নধর্মী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এর আগে সাধারণত পেশাদার কূটনীতিকদেরই এ ধরনের দায়িত্বে দেখা গেছে।

দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে জনগণকেন্দ্রিক ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো দুই দেশের মধ্যে বড় আকারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও বাণিজ্য ভারসাম্য, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন অশুল্ক বাধা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

মঙ্গলবারের বৈঠকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তার মন্ত্রণালয়ে আসার বিষয়টিও উল্লেখ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের রাজনীতি সম্পর্কে নির্বাচিত সরকারই সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারে। তার এই বক্তব্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করে দেশের জনগণ ও নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়ার অবস্থান ফুটে উঠেছে।

বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীও দুই দেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কথা জানান। তিনি বলেন, আলোচনায় পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও সরকারের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে সামনে এসেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে আয়োজনের জন্য প্রস্তুতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাস্তবতা বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং মানুষের পারস্পরিক যাতায়াতের কারণে সম্পর্কটি কেবল কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে।

এ কারণে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সীমান্তে স্বাভাবিক চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনের সহজীকরণ, চিকিৎসা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা—এসব বিষয় দুই দেশের জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে মুক্ত বাণিজ্যের আলোচনা বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, স্থানীয় শিল্পের স্বার্থ এবং বাণিজ্য ভারসাম্যের মতো বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ফলে একটি কার্যকর বাণিজ্য কাঠামো গড়ে তুলতে হলে দুই দেশের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে সেই বাস্তবতার কথাও উঠে এসেছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, দুই দেশেরই নিজস্ব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব বিষয়কে উপেক্ষা না করে আলোচনার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান খোঁজাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎমুখী সহযোগিতার সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ও রয়েছে। পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ভারসাম্য, পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ এবং পারস্পরিক বাজারে প্রবেশাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে অগ্রগতি হলে রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণের মধ্যকার আস্থাও বাড়তে পারে।

শেষ পর্যন্ত দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং জনগণের স্বার্থকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য বাস্তবসম্মত সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা গেলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে। আর দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তারই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত