রোগীর মৃত্যুতে শজিমেকে স্বজন-চিকিৎসক সংঘর্ষ, আহত ১২

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২২ বার
রোগীর মৃত্যুতে শজিমেকে স্বজন-চিকিৎসক সংঘর্ষ, আহত ১২

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, শজিমেকে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়।

ঘটনার পর হাসপাতালে কর্মরত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নিজেদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির মধ্যেও জ্যেষ্ঠ ও অন্যান্য পর্যায়ের চিকিৎসকদের মাধ্যমে হাসপাতালের জরুরি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রোগীর ছয় স্বজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যদের থানায় রাখা হয়েছে। তবে ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া শহরের রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমাজনিত জটিলতা নিয়ে শজিমেক হাসপাতালের সপ্তম তলার মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মঙ্গলবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

রোগীর মৃত্যুর পরপরই স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার কারণে আব্দুল মালেকের মৃত্যু হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। রোগীর মৃত্যু নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রথমে কথা-কাটাকাটির সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

একপর্যায়ে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, রোগীর কয়েকজন স্বজন এবং তাদের সঙ্গে থাকা কিছু বহিরাগত ব্যক্তি ওয়ার্ডে উপস্থিত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও মুহূর্তের মধ্যে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ওই সময় কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু উত্তেজনা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এক ইন্টার্ন চিকিৎসক অন্যদের সহায়তায় এগিয়ে গেলে তাকেও মারধরের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন চিকিৎসকরা।

পরে হাসপাতালের অন্যান্য ইন্টার্ন চিকিৎসক ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল একটি স্থানে এই সংঘর্ষে রোগী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক রোগীর স্বজন নিরাপত্তার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

খবর পেয়ে বগুড়া সদর থানা-পুলিশ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আহত কয়েকজনকে উদ্ধার করে নিরাপত্তার স্বার্থে হেফাজতে নেয়।

আহতদের মধ্যে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীর স্বজন উভয় পক্ষের সদস্য রয়েছেন। চিকিৎসকদের দাবি, হামলায় তাদের কয়েকজন সহকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। কারও কারও হাতে গুরুতর আঘাত লেগেছে বলেও তারা জানিয়েছেন।

ইন্টার্ন চিকিৎসক রিতুল মণ্ডল স্নিগ্ধ অভিযোগ করেন, বহিরাগতদের হামলায় অন্তত ছয়জন চিকিৎসক আহত হয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন চিকিৎসক গুরুতর আঘাত পেয়েছেন এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একজন চিকিৎসক যদি কর্মস্থলে নিরাপদ না থাকেন, তাহলে রোগীদের সেবা প্রদানও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে তারা কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

চিকিৎসকদের কর্মবিরতির ঘোষণায় সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরো চিকিৎসাব্যবস্থা বন্ধ হয়নি। জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক এবং অন্যান্য পর্যায়ের চিকিৎসকদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

শজিমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মনজুর-এ-মোর্শেদ চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সংঘর্ষে ইন্টার্ন ও মিড-লেভেল মিলিয়ে কয়েকজন চিকিৎসক আহত হয়েছেন। ঘটনার পর হাসপাতালের প্রশাসন এবং জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক নেতারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করছেন।

তিনি বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়নি। রোগীদের দুর্ভোগ কমাতে জ্যেষ্ঠ ও মিড-লেভেলের চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসা কার্যক্রম চালু রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই ঘটনার পর। রোগীর মৃত্যু বা চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগ থাকলে তার আইনগত ও প্রশাসনিক প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগের সমাধান সহিংসতার মাধ্যমে করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং হাসপাতালের চিকিৎসা পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে রোগীর স্বজনদের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। আব্দুল মালেকের মৃত্যু চিকিৎসাগত কোনো জটিলতার কারণে হয়েছে নাকি চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা ছিল—তা যথাযথ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগকে নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ নিতে হবে।

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইব্রাহিম আলী জানিয়েছেন, রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ভুল চিকিৎসার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তিনি জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং অন্য কয়েকজনকে থানায় রাখা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা এবং নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই উদ্বেগের বিষয়। প্রতিদিন অসংখ্য রোগী জীবন রক্ষার আশায় হাসপাতালে আসেন। সেখানে চিকিৎসক, রোগী ও স্বজনদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন রোগীর মৃত্যু পরিবারের জন্য গভীর শোকের এবং আবেগের মুহূর্ত। প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আবেগ যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে নতুন সংকট সৃষ্টি হয় এবং অন্য রোগীদের চিকিৎসাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

একইভাবে চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। চিকিৎসাসেবা একটি অত্যন্ত চাপপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পেশা। কর্মস্থলে হামলার ভয় থাকলে চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনে মানসিক চাপ বাড়তে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ রোগীদের ওপরও পড়তে পারে।

শজিমেক হাসপাতালের মঙ্গলবার রাতের ঘটনাটি তাই শুধু একটি সংঘর্ষের ঘটনা নয়; এটি হাসপাতালের নিরাপত্তা, রোগীর অধিকার, চিকিৎসকদের সুরক্ষা এবং চিকিৎসাসেবার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এখন সবার নজর পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কবে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেন, সেদিকে। পাশাপাশি রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ এবং চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দাবি উঠেছে।

পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে হাসপাতাল প্রশাসন চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

রোগীর মৃত্যু নিয়ে শোকাহত একটি পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষোভ এবং হাসপাতালে চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা সাধারণ রোগীদের দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে শজিমেকের এই ঘটনা একটি জটিল মানবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সুষ্ঠু তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমেই এই ঘটনার গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত