নতুন পে স্কেলে বছরে বাড়তি ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
নতুন পে স্কেলে বছরে বাড়তি ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নতুন জাতীয় পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। বিপুল এই অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি। নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক চাপ মোকাবিলায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে, এনবিআরকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের নতুন পে স্কেলকে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হলেও এর বাস্তবায়ন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সরকারি অর্থব্যবস্থাপনার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে, অন্যদিকে এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে—সেটিই এখন অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় প্রশ্ন।

সাম্প্রতিক সময়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রয়োজনীয় উপায় খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে যে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে, তার একটি বড় অংশ অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যমে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য আগের বছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ হবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজস্ব আদায়ে এক বছরের ব্যবধানে এত বড় প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ। কর্মকর্তাদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আমদানি খাতের অবস্থার কারণে রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত গতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

সরকার গত ৩১ আগস্ট জাতীয় পে স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে। নতুন কাঠামোর আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখের বেশি পেনশনভোগী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। দীর্ঘদিন পর সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে।

তবে নতুন পে স্কেল একসঙ্গে পুরোপুরি কার্যকর করা হচ্ছে না। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আর্থিক চাপ এবং সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরজুড়ে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

নতুন পে স্কেলের মূল বেতন তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে পরবর্তী পর্যায়ে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে একসঙ্গে বিপুল অর্থের চাপ কমানো সম্ভব হবে এবং অর্থনীতিতে হঠাৎ অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এত বড় অঙ্কের অর্থ সরকারি ব্যয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। ফলে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কর ফাঁকি রোধ এবং নতুন রাজস্ব উৎস খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ সময় ধরে একই বেতন কাঠামো কার্যকর থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নতুন বেতন কাঠামোর মাধ্যমে কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি, কর্মোদ্দীপনা বাড়ানো এবং জনসেবামুখী প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষ করে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম বেতনের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তও রয়েছে। একই সঙ্গে পেনশনভোগীদের জন্যও নতুন কাঠামোর আওতায় সুবিধা বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে স্বস্তি আনতে পারে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগান দিতে গিয়ে যদি অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি হয় বা সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

এনবিআরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বাস্তবসম্মত কৌশল তৈরি করা। শুধু প্রচলিত করদাতাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে এত বড় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতার অভিযোগ রয়েছে। করের আওতার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য করদাতা, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রয়োগ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন খাতে কর ছাড়ের কারণে সরকার সম্ভাব্য রাজস্বের পুরোটা সংগ্রহ করতে পারে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে স্কেলের মতো বড় সরকারি ব্যয় টেকসইভাবে পরিচালনা করতে হলে রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি কর প্রশাসনের দক্ষতা উন্নয়নও জরুরি। একই সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ এমন রাখতে হবে, যাতে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত না করে।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্প উৎপাদনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংক্রান্ত সমস্যা, ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্থরতা এবং আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব রাজস্ব সংগ্রহে পড়তে পারে।

বিশেষ করে আমদানি শুল্কনির্ভর রাজস্ব খাতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমদানি কমে গেলে কাস্টমস পর্যায়ে আদায় কমতে পারে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা ও উৎপাদন প্রত্যাশিত গতিতে না বাড়লে ভ্যাট এবং আয়কর সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত বেশি হলে তা অর্জনের জন্য কর প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে করদাতাদের ওপর অযৌক্তিক চাপ পড়ার ঝুঁকিও থাকে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো ফাহমিদা খাতুনও এনবিআরের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে এত বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, শুধু উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই রাজস্ব সংগ্রহ বাড়বে না; এর জন্য কর ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে এখন সরকারকে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে সামাল দিতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং বাজেট ঘাটতি ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় বিবেচনা করা হয়েছে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

তবে বাস্তবায়নের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতার ওপর। এনবিআর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার কতটা অর্জন করতে পারে এবং নতুন রাজস্ব উৎস তৈরি করতে পারে কি না, তা আগামী মাসগুলোতে স্পষ্ট হবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল একটি বড় স্বস্তির সিদ্ধান্ত হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাজস্ব, বাজেট, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা।

আগামী দিনগুলোতে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের গতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিস্থিতি এবং মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠবে। ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয়ের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সরকারি অর্থব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।

সরকার এখন একদিকে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান ও আর্থিক নিরাপত্তা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে, অন্যদিকে সেই প্রতিশ্রুতির অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করছে। নতুন পে স্কেলের সুফল কতটা টেকসই হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে বাড়তি ব্যয়ের অর্থ সংগ্রহে সরকারের সক্ষমতা এবং রাজস্ব ব্যবস্থার কার্যকর সংস্কারের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত