জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেল ৫০০ বিঘার আমন ধান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২১ বার
জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেল ৫০০ বিঘার আমন ধান

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রামের কৃষকদের চোখে এখন শুধু হতাশা আর অনিশ্চয়তা। বছরের পর বছর পরিশ্রম করে, ঋণ নিয়ে এবং পরিবারের ভবিষ্যতের আশায় জমিতে রোপণ করা আমন ধান এখন পানির নিচে তলিয়ে আছে। শাখা বরাক নদীতে মাছ ধরার ফাঁদ বসিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা এবং নদীর অপরিকল্পিত খননের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ৫০০ বিঘারও বেশি জমির রোপা আমন ধান ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

টানা বৃষ্টি এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের চানপুর, কাটারাই, খঞ্জনপুর, সাটিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে পানি জমে রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জমিতে পানি আটকে থাকায় ধানের গাছ পচে নষ্ট হতে শুরু করেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত পানি না নামলে চলতি মৌসুমের অধিকাংশ আমন ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এলাকার বুক চিরে বয়ে যাওয়া শাখা বরাক নদীটি একসময় পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নদীটি ভরাট হতে হতে অনেকাংশে মৃতপ্রায় খালে পরিণত হয়। এলাকার কৃষিজমির অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকার পানি এই নদী দিয়েই বেরিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সেই স্বাভাবিক ব্যবস্থা কার্যকর নেই।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নদীটির প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার অংশ খনন করে। তবে সেই খনন কাজ নিয়ে শুরু থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। তাদের অভিযোগ, নদীতীরবর্তী অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ না করে সীমিত পরিসরে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ফুট প্রশস্ত করে খনন করা হয়। ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও পানি ধারণক্ষমতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

কৃষকদের দাবি, খননের পরও নদীর কিছু অংশে পানি চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। বিশেষ করে নবীগঞ্জ এলাকার দিকে নদীর মুখ যথাযথভাবে উন্মুক্ত না থাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খনন না হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানি জমে থাকার সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

এর সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে মাছ ধরার জন্য নদীতে তৈরি করা বাঁশের ফাঁদ ও চাটাইয়ের কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা। স্থানীয়দের অভিযোগ, শাখা বরাক নদীর সাটিয়া পয়েন্ট এবং গোরারাই গ্রামের কাছাকাছি কয়েকটি স্থানে বাঁশের খুঁটি, জাল ও চাটাই ব্যবহার করে মাছ ধরার ফাঁদ বসানো হয়েছে। এসব ফাঁদের কারণে নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি কৃষিজমিতে আটকে পড়ছে। ফলে একদিকে জমিতে পানি বাড়ছে, অন্যদিকে দিনের প্রচণ্ড রোদে পানির নিচে থাকা ধানের গাছ দ্রুত পচে যাচ্ছে। কৃষকদের ভাষায়, কয়েক মাসের শ্রম চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখা ছাড়া এখন তাদের আর কিছু করার নেই।

কাটারাই গ্রামের কৃষক ছানু মিয়া জানান, তিনি দুই দফায় জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছেন। প্রথম দফার চারা ক্ষতির মুখে পড়ার পর নতুন করে চারা সংগ্রহ করে আবার জমিতে রোপণ করেন। কিন্তু দ্বিতীয়বারের ফসলও এখন পানির নিচে ডুবে আছে।

তার আক্ষেপ, নদীর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা সঠিক না থাকায় কৃষকদের দুর্ভোগ বছরের পর বছর বাড়ছে। এর ওপর মাছ ধরার জন্য নদীতে ফাঁদ বসিয়ে পানি আটকে রাখার কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। তার ভাষায়, দিনের পর দিন পানির নিচে থাকা ধান গরম রোদে পচে যাচ্ছে এবং এবার ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন এলাকার অন্য কৃষকরাও। কাটারাই গ্রামের দুরুদ মিয়া এবং খঞ্জনপুর এলাকার শিক্ষক রিংকু চৌধুরী জানান, অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে আমন ধান চাষ করেছেন। জমি তৈরি, চারা কেনা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে ইতোমধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে।

তাদের মতে, কৃষকের জন্য একটি মৌসুমের ফসল শুধু খাদ্য বা আয় নয়, এটি পুরো বছরের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। একটি মৌসুমের ফসল নষ্ট হলে অনেক পরিবারকে ঋণের বোঝা বহন করতে হয়। এবারও ৫০০ বিঘার বেশি জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু কৃষক পরিবার বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে পানি নিষ্কাশনের সমস্যার সমাধান চেয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলেছেন। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতি বারবার একই জায়গায় ফিরে আসছে। তাদের দাবি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে শুধু আংশিক খনন যথেষ্ট নয়; নদীর মুখ, দখল, অবৈধ প্রতিবন্ধকতা এবং পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

খলিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু মিয়া চৌধুরী জানিয়েছেন, নদীতে বাঁশের ফাঁদ ও খাটিয়া বসানোর কারণে বিভিন্ন স্থানে এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত পানি জমে থাকছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও কিছু জেলে এখনও মাছ ধরার ফাঁদ অপসারণ করেননি।

তিনি বলেন, স্থানীয় ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে দ্রুত এসব প্রতিবন্ধকতা অপসারণের চেষ্টা চলছে। প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষিজমিতে পানি আটকে রেখে কৃষকদের ক্ষতির মুখে ফেলে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা নিতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব হোসেন জানিয়েছেন, নদীতে ফাঁদ পেতে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে কৃষকদের ক্ষতি করার কোনো সুযোগ নেই। যারা এমন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তার বক্তব্যে কৃষকদের মধ্যে কিছুটা আশা তৈরি হলেও ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চান। তাদের প্রধান দাবি, যত দ্রুত সম্ভব নদী থেকে সব ধরনের ফাঁদ ও কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হোক। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে নদীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হোক।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আমন ধান দীর্ঘ সময় পানির নিচে ডুবে থাকলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। পানি জমে থাকলে শিকড়ে অক্সিজেনের সংকট দেখা দেয় এবং দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা থাকলে গাছ পচে যেতে পারে। বিশেষ করে পানি দ্রুত না নামলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই এখন সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কৃষকরা। প্রতিদিন পানি জমে থাকার অর্থ আরও বেশি জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। অনেক কৃষক এখনও আশা করছেন, দ্রুত পানি নেমে গেলে হয়তো কিছু জমির ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে।

মৌলভীবাজারের এই ঘটনা শুধু কয়েকটি গ্রামের কৃষকের দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি পানি ব্যবস্থাপনা, নদী রক্ষা এবং কৃষিজমি সুরক্ষার একটি বড় প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। নদী ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষি, পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর।

একদিকে নদীর নাব্যতা ও পানি নিষ্কাশনের সংকট, অন্যদিকে ব্যক্তিগত স্বার্থে নদীতে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা তৈরি—এই দুই সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে এখন সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা। বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে যারা দেশের খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখেন, তাদের ফসল রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চোখ এখন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দিকে। তাদের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীর ফাঁদ অপসারণ করে পানি নিষ্কাশনের পথ খুলে দেওয়া গেলে হয়তো এখনও কিছু আমন ধান রক্ষা করা সম্ভব হবে।

তবে সময় যত গড়াবে, ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে—এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বেশি। পানির নিচে ডুবে থাকা সবুজ ধানের ক্ষেত ধীরে ধীরে হলুদ হয়ে পচে যাচ্ছে। যে ক্ষেত একসময় কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই ক্ষেতই এখন তাদের চোখে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের ছবি হয়ে উঠেছে।

মৌলভীবাজারের খলিলপুর ইউনিয়নের এই ৫০০ বিঘার বেশি জমির আমন ধান রক্ষা করা এখন শুধু কৃষকদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়, এটি স্থানীয় কৃষি ও বহু পরিবারের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জরুরি বিষয়। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করা গেলে ক্ষতির একটি অংশ হয়তো ঠেকানো সম্ভব হবে। আর তা না হলে চলতি মৌসুমে শত শত কৃষককে তাদের পরিশ্রমের ফসল হারানোর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত