সি চিন পিংয়ের মিসর সফরে বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮ বার
সি চিন পিংয়ের মিসর সফরে বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে মিসর সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। প্রায় এক দশক পর আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটিতে তাঁর এই সফরকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও বৈশ্বিক দক্ষিণে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং মিসরের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সফরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

মঙ্গলবার কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সি চিন পিংকে স্বাগত জানান মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। তাঁকে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদার লালগালিচা অভ্যর্থনা। সামরিক সদস্যদের কুচকাওয়াজের পাশাপাশি স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও ছিল অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে। দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও সফরকে ঘিরে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

সি চিন পিংয়ের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্যপথ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার মাধ্যমে মিসর তার কৌশলগত বিকল্প বাড়াতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

মিসর ও চীনের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। প্রায় ৭০ বছর আগে মিসরই প্রথম আরব ও আফ্রিকান দেশ হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ক গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির চীন সফর এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির পর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

মিসরের প্রেসিডেন্ট আল-সিসি সম্প্রতি চীন-মিসর সম্পর্ককে বৈশ্বিক দক্ষিণের ভূমিকা শক্তিশালী করার অংশীদারত্ব হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা গেছে। অন্যদিকে সি চিন পিংও দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে আরও গভীর সহযোগিতার প্রত্যাশা জানিয়েছেন।

এই সম্পর্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিকগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা। গত কয়েক বছরে মিসরের অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে চীনা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মিসরের বন্দর, শিল্পকারখানা, সৌরশক্তি, গ্রিন হাইড্রোজেন এবং প্রযুক্তি খাতে চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। ফলে মিসরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় চীনের ভূমিকা দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মিসরের ভৌগোলিক অবস্থানও চীনের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। দেশটির মধ্য দিয়ে সুয়েজ খাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সমুদ্রপথের যোগাযোগে সুয়েজ খালের গুরুত্ব অপরিসীম। একই সঙ্গে মিসর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে মিসরে অর্থনৈতিক উপস্থিতি জোরদার করা চীনের জন্য বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ কৌশলের অংশ হতে পারে।

অর্থনীতির পাশাপাশি সামরিক সহযোগিতাও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত মাসে মিসর ও চীন দ্বিতীয়বারের মতো যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন করে। এই মহড়াকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই সামরিক মহড়ায় চীন প্রথমবারের মতো আফ্রিকার মাটিতে তাদের জে-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে। একই মহড়ায় চীনা যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমানও অংশ নেয়। এমনকি চীনের একটি আকাশযানকে রাফাল যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহ করতে দেখা যায়। সামরিক প্রযুক্তি ও সক্ষমতার দিক থেকে এ ধরনের মহড়া দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন পরিসর নির্দেশ করে।

তবে মিসরের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা মানেই যে কায়রো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইছে, এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং মিসর একাধিক বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে মিসর প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক কায়রোর জন্য এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক যুদ্ধ ও সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়ে মিসরের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনতে পারে। গাজা ও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, মিসরও তার বাইরে নয়। ফলে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি বেইজিং, মস্কো ও ইউরোপের সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার নীতি কায়রোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মিসরের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে দেশটির প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক বাস্তবতা। একদিকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন, অন্যদিকে লিবিয়া ও সুদান—সব মিলিয়ে মিসর এমন একটি অঞ্চলে অবস্থান করছে, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সংকট দীর্ঘদিনের। একই সঙ্গে ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালের সঙ্গে দেশটির যোগাযোগ তাকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

চীনের জন্য তাই মিসরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা শুধু কায়রোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ, আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তার মতো বিষয়ও যুক্ত। চীন দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। মিসর সেই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।

বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতেও চীন ও মিসরের অবস্থানের মধ্যে কিছু অভিন্নতা রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি চীনা প্রেসিডেন্ট জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে বৈঠকেও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ফলে সি চিন পিংয়ের মিসর সফরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধানের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

চীনের দৃষ্টিতে মিসর আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ—আফ্রিকা। আফ্রিকায় চীনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি গত দুই দশকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মিসরকে কেন্দ্র করে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। বন্দর, জ্বালানি, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়লে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও গভীর হতে পারে।

চলতি বছরে এটি সি চিন পিংয়ের দ্বিতীয় বিদেশ সফর এবং মিসর সফরটি তাঁর চলমান আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে তিনি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনে অংশ নিতে কিরগিজস্তান সফর করেন। সেখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। পরবর্তী সময়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।

সব মিলিয়ে সি চিন পিংয়ের মিসর সফরকে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়বে না। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন, চীনের অর্থনৈতিক বিস্তার, সামরিক সহযোগিতার বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের রাজনীতিতে প্রভাব বাড়ানোর প্রচেষ্টার সঙ্গে এই সফর গভীরভাবে যুক্ত।

মিসরের জন্যও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। কায়রো একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রেখে অন্যদিকে চীন, রাশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে নিজের কৌশলগত পরিসর বিস্তৃত করতে চাইছে। আর চীনের জন্য মিসর হতে পারে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপমুখী বাণিজ্যপথে আরও শক্ত অবস্থান তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে সি চিন পিংয়ের এই সফরের ফলাফল শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক কূটনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত