রায় লেখায় এআই চলবে, নির্ভরশীল হওয়া যাবে না: আইনমন্ত্রী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
রায় লেখায় এআই চলবে, নির্ভরশীল হওয়া যাবে না: আইনমন্ত্রী

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিচারিক রায় লেখার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে, তবে কোনোভাবেই এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তাঁর মতে, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে বিচারব্যবস্থাতেও এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা জরুরি হয়ে উঠেছে। তবে আদালতের মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে এর সম্ভাব্য ঝুঁকি, সীমাবদ্ধতা এবং প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বুধবার সকালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি আয়োজিত একটি সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিচারপ্রক্রিয়ায় এআইয়ের সম্ভাব্য ব্যবহার এবং এ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও সতর্কতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, রায় লেখার সময় বিচারকরা প্রয়োজন অনুযায়ী এআইয়ের সহায়তা নিতে পারেন। তবে রায়ের বিষয়বস্তু, আইনের ব্যাখ্যা কিংবা বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। কারণ আদালতের সিদ্ধান্ত শুধু তথ্য বা নথির ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয় না; এর সঙ্গে আইনের ব্যাখ্যা, মামলার বাস্তবতা, সাক্ষ্য-প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং বিচারকের নিজস্ব বিচারবোধও গভীরভাবে যুক্ত।

প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, প্রশাসন, গবেষণা ও যোগাযোগের মতো খাতের পাশাপাশি আইন ও বিচারব্যবস্থাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দেশে আইনি নথি বিশ্লেষণ, তথ্য অনুসন্ধান, মামলার নথি সাজানো এবং গবেষণার কাজে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের নজির তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশও প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। বিচারব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিপুলসংখ্যক মামলা, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা বিচারপ্রক্রিয়া এবং আদালতে জমে থাকা নথিপত্র ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা সময় ও শ্রম কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি বিচারিক স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলো অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, এআইয়ের সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে একটি বিল আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের জন্য একটি আইন প্রণয়নের কাজ করছে বলেও জানান তিনি। এর মাধ্যমে এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকে একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এআই নিয়ে সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আইনমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্ব এবং বাংলাদেশ এআইয়ের যুগে প্রবেশ করেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির সব ধরনের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে বিচারব্যবস্থার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে এআইয়ের ভুল বা অপব্যবহারের প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

বিচারব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো নির্ভুলতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারলেও তার তৈরি করা তথ্য বা বিশ্লেষণ সবসময় সঠিক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এআই ভুল তথ্য তৈরি করতে পারে, অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত দিতে পারে কিংবা বিদ্যমান তথ্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। আদালতের রায়ে এমন ভুলের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিচারিক দায়বদ্ধতা। একজন বিচারক যে রায় দেন, তার জন্য তাঁকেই আইনগত ও নৈতিকভাবে দায় বহন করতে হয়। কোনো এআই ব্যবস্থা যদি ভুল তথ্য বা ভুল আইনি ব্যাখ্যা সরবরাহ করে, সেই ভুলের দায় কে নেবে—এ প্রশ্নও সামনে আসে। এ কারণে এআইকে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মানুষের হাতেই থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রায় লেখার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করলে বিচারকদের কাজের কিছু অংশ সহজ হতে পারে। বড় মামলার নথি দ্রুত বিশ্লেষণ, বিভিন্ন আইন ও নজির খুঁজে বের করা, নথিপত্রের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য শনাক্ত করা কিংবা দীর্ঘ বক্তব্যকে সংক্ষিপ্তভাবে সাজানোর মতো কাজে এআই সহায়ক হতে পারে। এতে বিচারকদের সময় বাঁচতে পারে এবং তাঁরা মামলার মূল আইনি ও বিচারিক বিষয়গুলো বিশ্লেষণে আরও বেশি সময় দিতে পারেন।

তবে এই সুবিধাকে কখনোই বিচারকের নিজস্ব চিন্তা ও বিচারবোধের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। একটি মামলার দুই পক্ষের বক্তব্য একই হলেও মামলার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে। সাক্ষ্য-প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা, ঘটনার সামাজিক ও মানবিক প্রেক্ষাপট এবং আইনের নির্দিষ্ট প্রয়োগের বিষয়গুলো অনেক সময় এমন সূক্ষ্ম বিচারিক বিশ্লেষণ দাবি করে, যা শুধু তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

বিশেষ করে ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের প্রশ্নটি আরও সংবেদনশীল। একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা, সুনাম বা ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর আদালতের সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো প্রযুক্তিগত ভুল যদি এমন মামলায় প্রভাব ফেলে, তার পরিণতি একজন মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ফলে বিচারিক কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

এআই ব্যবহারের সঙ্গে তথ্যের গোপনীয়তার বিষয়টিও জড়িত। আদালতের মামলার নথিতে ব্যক্তিগত তথ্য, সাক্ষীর পরিচয়, আর্থিক তথ্য, পারিবারিক বিষয় এবং বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য থাকতে পারে। এসব তথ্য কোনো এআই ব্যবস্থায় ব্যবহারের আগে তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তার নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্পষ্ট আইন ও নীতিমালা না থাকলে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে গিয়ে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আইনমন্ত্রী যে এআই ব্যবহারের জন্য আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, তার গুরুত্ব এখানেই। প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আজ যে এআই ব্যবস্থা কার্যকর, কয়েক বছর পর সেটি আরও উন্নত কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপিত হতে পারে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ না করে এআই ব্যবহারের মৌলিক নীতি, দায়িত্ব, জবাবদিহি, তথ্য সুরক্ষা ও মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো আইনি কাঠামোর আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ।

বিচারব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিচারক, আইনজীবী ও আদালতের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। প্রযুক্তির সুবিধা সম্পর্কে যেমন তাঁদের জানতে হবে, তেমনি এআইয়ের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ভুল সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। কোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে তার ফলাফল যাচাই করার সক্ষমতা না থাকলে প্রযুক্তি সহায়কের পরিবর্তে ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই একদিকে প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে স্বীকার করা হয়েছে, অন্যদিকে অন্ধ নির্ভরতার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, এআই বিচারিক প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু বিচারকের জায়গা নিতে পারে না। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে হবে আইন, প্রমাণ, যুক্তি ও মানবিক বিবেচনার ভিত্তিতে।

বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় এ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া দ্রুত প্রয়োগ করাও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রযুক্তির সুবিধা ও মানবিক বিচারবোধের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হতে পারে ভবিষ্যৎ বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকার এআই নিয়ে আইন প্রণয়নের কাজ করছে—এমন ঘোষণার ফলে বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে প্রস্তাবিত আইন ও নীতিমালায় বিচারব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের সীমা, দায়বদ্ধতা এবং মানুষের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কীভাবে নিশ্চিত করা হয়, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের। কারণ আদালতে প্রযুক্তির ব্যবহার যতই বাড়ুক, ন্যায়বিচারের মূল লক্ষ্য যেন কোনোভাবেই প্রযুক্তিগত দক্ষতার আড়ালে হারিয়ে না যায়—সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত