ঢাকার যানজট কমাতে সরছে চার বাস টার্মিনাল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮ বার
ঢাকার যানজট কমাতে সরছে চার বাস টার্মিনাল

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার যানজট যেন নগরবাসীর প্রতিদিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মঘণ্টার শুরু কিংবা শেষ—রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, বাসের অতিরিক্ত চাপ, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং টার্মিনালকেন্দ্রিক বিশৃঙ্খলা নিয়মিতভাবেই মানুষের চলাচলকে ধীর করে দেয়। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে এবার রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যানজট কমাতে গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গুলিস্তানের চারটি বাস টার্মিনালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এগুলো দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ডিপোগুলোকে কাজে লাগানো, বিকল্প এলাকায় টার্মিনাল গড়ে তোলা, গাবতলী টার্মিনাল সম্প্রসারণ এবং ঢাকার আশপাশের সড়কে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।

রোববার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলনকক্ষে বৃহত্তর ঢাকার যানজট নিরসনে গঠিত জাতীয় কমিটির সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এসব তথ্য জানান। সভায় রাজধানী ও বৃহত্তর ঢাকার যানজট নিরসনে আগে নেওয়া নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি কোন উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজধানীর যানজটের অন্যতম বড় কারণ শহরের অভ্যন্তরে বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনের অতিরিক্ত চাপ। বিভিন্ন আন্তঃনগর ও দূরপাল্লার বাস যখন নগরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রবেশ করে, তখন টার্মিনালকেন্দ্রিক যানজটের পাশাপাশি আশপাশের সড়কেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাসের কাউন্টার, যাত্রী ওঠানামা, পার্কিং এবং অপেক্ষমাণ যানবাহন মূল সড়কের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে।

এই চাপ কমাতেই বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প স্থান ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কাঁচপুর ও পূর্বাচল এলাকায় বিদ্যমান অবকাঠামো ও ডিপোগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর ফলে দূরপাল্লার বাসের একটি অংশ রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ কেন্দ্রীয় এলাকায় না ঢুকেই নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি টার্মিনাল শুধু বাস দাঁড়ানোর জায়গা নয়; সেখানে যাত্রীদের অপেক্ষা, টিকিট কাউন্টার, যানবাহন পার্কিং, বিশ্রাম, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবার ব্যবস্থা থাকতে হয়। তাই বিকল্প স্থানে টার্মিনাল স্থানান্তরের আগে যাত্রীদের সুবিধা ও পরিবহন পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

গাবতলী টার্মিনাল নিয়েও আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে। টার্মিনালের পাশের নতুন জায়গাগুলো দ্রুত কাজে লাগিয়ে এর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। রাজধানীর উত্তর-পশ্চিম প্রবেশপথে গণপরিবহনের চাপ নিয়ন্ত্রণে গাবতলীর সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ঢাকার বাইরের প্রবেশপথগুলোতে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সড়কের ওপর থাকা অবৈধ স্থাপনাকে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সড়কের জায়গা দখল করে দোকানপাট, অস্থায়ী স্থাপনা কিংবা অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় যান চলাচলের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করে সড়ককে স্বাভাবিক যান চলাচলের উপযোগী করার বিষয়েও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, শুধু ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকার যানজট কমানোর চেষ্টা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। রাজধানীর সঙ্গে আশপাশের জেলা ও শিল্পাঞ্চলগুলোর যোগাযোগব্যবস্থাকেও একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। কারণ প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা থেকে ঢাকায় প্রবেশ করে এবং দিনের শেষে আবার এসব এলাকায় ফিরে যায়।

এই প্রবাহ সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে না পারলে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ কমানো কঠিন। তাই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়কের প্রতিবন্ধকতা দূর করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং গণপরিবহনের চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সভায় সিটি করপোরেশনগুলোর ব্যবস্থাপনায় থাকা টার্মিনালগুলোর উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। যেসব টার্মিনাল ব্যবহারযোগ্য রয়েছে, সেগুলোকে আধুনিক ও কার্যকর করে তুলতে বাস কাউন্টার স্থাপন, যাত্রীসুবিধা বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে এসি বাসগুলোকে নির্দিষ্ট টার্মিনাল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীর সড়কে বাসের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থান এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা দীর্ঘদিন ধরে যানজটের অন্যতম কারণ। অনেক সময় নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামানো, রাস্তার পাশে অপেক্ষা করা কিংবা কাউন্টারকেন্দ্রিক ভিড়ের কারণে মূল সড়কে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, শুধু টার্মিনাল সরিয়ে দিলেই ঢাকার যানজটের স্থায়ী সমাধান হবে না। বাস রুটের পুনর্বিন্যাস, নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা, পর্যাপ্ত পার্কিং, সড়ক ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং গণপরিবহনের মধ্যে সমন্বয়—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প টার্মিনালে যাত্রী পৌঁছানোর জন্য সহজ ও নির্ভরযোগ্য সংযোগব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের বর্তমান উদ্যোগে তাই শুধু চারটি টার্মিনাল সরানোর বিষয় নয়, বরং রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র থেকে বিকেন্দ্রীকরণের একটি পরিকল্পনাও দেখা যাচ্ছে। এর সফল বাস্তবায়ন হলে দূরপাল্লার বাসের একটি বড় অংশ রাজধানীর ব্যস্ত কেন্দ্রীয় সড়কে প্রবেশ না করেই নির্ধারিত এলাকায় যাত্রীসেবা দিতে পারবে। এতে শহরের ভেতরের সড়কে বাসের চাপ কমার পাশাপাশি গণপরিবহনের চলাচলেও শৃঙ্খলা ফিরতে পারে।

সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। কারণ অতীতে রাজধানীর যানজট কমাতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।

জাতীয় কমিটির এই সভায় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, সড়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ফলে এবার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে একাধিক সরকারি সংস্থার সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীর লাখো মানুষের জন্য যানজট শুধু সময়ের অপচয় নয়; এটি কর্মঘণ্টা নষ্ট করে, গণপরিবহনে ভোগান্তি বাড়ায় এবং দৈনন্দিন জীবনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকা মানুষের কাছে একটি কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা তাই কেবল অবকাঠামোগত প্রয়োজন নয়, বরং নাগরিক জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রত্যাশা।

চারটি বাস টার্মিনালকে ঘিরে সরকারের নতুন উদ্যোগ কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিকল্প টার্মিনাল ও ডিপো প্রস্তুত করা, প্রয়োজনীয় যাত্রীসুবিধা নিশ্চিত করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পরিবহন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গেলে উদ্যোগটি রাজধানীর যানজট ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়নের গতি, শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিকতার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত