সম্পত্তি হস্তান্তর বিলের প্রতিবাদে জামায়াতের বিক্ষোভ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
সম্পত্তি হস্তান্তর বিলের প্রতিবাদে জামায়াতের বিক্ষোভ

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হওয়ার পর এর বিরোধিতা করে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে বিলটিকে কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করা হয়েছে। একই ইস্যুতে সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানিয়ে ওয়াকআউট করায় বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কর্মসূচিতে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির ও সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেবেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। বিলটি নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি এটি সংশোধন বা বাতিলের দাবিও সেখানে জোরালোভাবে উত্থাপিত হতে পারে।

সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয় রোববার। সংশোধিত বিধানের মূল বিষয় হলো, নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তরের পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার ধরে রাখতে পারবেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ বিধান মূলত সম্পত্তি দান করার পরও অসহায় বা বয়স্ক বাবা-মায়ের বসবাস ও ভোগদখলের অধিকার সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।

বিলটি নিয়ে সংসদে আলোচনা চলার সময় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা দাবি করেন, প্রস্তাবিত সংশোধনী মুসলিম উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রচলিত ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। তারা বিলটি পাসের আগে বিষয়টি শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ ও আলেমদের মাধ্যমে পর্যালোচনার দাবি জানান।

বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও বিলটি নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করেন। তার পক্ষ থেকে ইসলামী ফাউন্ডেশন ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিরোধী দলের বক্তব্য ছিল, সম্পত্তি হস্তান্তর ও পারিবারিক অধিকারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আইন করার আগে ধর্মীয় বিধান, সামাজিক বাস্তবতা এবং প্রচলিত আইন—সব দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিলটির উদ্দেশ্য ও প্রভাব নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশোধিত বিধান সাধারণ দান, মুসলিম আইনের হেবা কিংবা প্রচলিত অন্যান্য বৈধ সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতিকে বাতিল বা পরিবর্তন করছে না। বরং নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দাতার জীবদ্দশায় ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষ আইনি ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বিলটি উপস্থাপন করেন। আলোচনার পর বিলটি পাসের প্রক্রিয়া শুরু হলে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানান। বিলটি জনমত যাচাই কিংবা বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবও উত্থাপিত হয়। তবে এসব প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। একপর্যায়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন। পরে তাদের অনুপস্থিতিতেই বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

বিলটি পাস হওয়ার পরই জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংসদের বাইরে প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা আসে। দলটির নেতারা বলছেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শরিয়াহর বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ কারণে সংসদের ভেতরে আপত্তি জানানোর পাশাপাশি রাজপথেও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবে দলটি।

সম্পত্তি নিয়ে আইনগত বিরোধ বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। অনেক পরিবারে জীবদ্দশায় সন্তানদের নামে জমি, বাড়ি বা অন্যান্য সম্পদ লিখে দেওয়ার পরও বাবা-মা ওই সম্পত্তিতে বসবাস বা ভোগদখল করে থাকেন। বাস্তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর মালিকানা ও দখল নিয়ে পারিবারিক বিরোধ দেখা দেয়। নতুন সংশোধনের পক্ষে সরকারের যুক্তি হলো, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দাতা বাবা-মায়ের জীবদ্দশার নিরাপত্তা ও ব্যবহারাধিকার নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে, বিরোধীদের আশঙ্কা হলো, সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনি কাঠামোর সঙ্গে ধর্মীয় উত্তরাধিকার ও হেবা ব্যবস্থার সম্পর্ক স্পষ্টভাবে নির্ধারণ না করা হলে ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি বা বিরোধ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম পরিবারের সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ফলে নতুন বিধানের প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে জামায়াতের ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং ধর্মীয় আইন ও প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আইনের সম্পর্ক নিয়ে চলমান বিতর্কের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। দলটি সংসদের ভেতরে যে আপত্তি জানিয়েছে, বিক্ষোভ সমাবেশে সেটিই আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে নেতারা সরকারের কাছে সংশোধিত আইনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানাতে পারেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদে কোনো বিল পাস হওয়ার পর বিরোধী দলের রাজপথে কর্মসূচি দেওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন কিছু নয়। তবে সম্পত্তি হস্তান্তরের মতো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি আইনকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় ব্যাখ্যা সামনে আসায় বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাবা-মায়ের সম্পত্তি সন্তানদের নামে হস্তান্তরের পর দাতার অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সেটি নিয়ে অনেকের কৌতূহল রয়েছে।

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশোধনের লক্ষ্য বাবা-মায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আর জামায়াতের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো, এই সুরক্ষা দিতে গিয়ে ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত সম্পত্তি হস্তান্তর ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো বিরোধ তৈরি হচ্ছে কি না। ফলে সামনে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আইনটির বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও আলোচনা আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকেও নজর থাকবে। বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনসমাগম হলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যান চলাচল ও জননিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তবে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের বিষয়ে আয়োজকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশিত।

সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল এখন আইনি কাঠামোর অংশ হয়ে যাওয়ায় এর ব্যাখ্যা, প্রয়োগ এবং বাস্তব প্রভাব নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে জামায়াতের ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি বিলটিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ককে সংসদের বাইরে আরও দৃশ্যমান করে তুলবে। ফলে সোমবারের কর্মসূচিতে দলটির নেতারা কী ধরনের বক্তব্য ও দাবি তুলে ধরেন, সেদিকেই এখন রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত