আয়কর রিটার্নে যেসব ব্যয়ের তথ্য দিতে হয়

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
আয়কর রিটার্নে যেসব ব্যয়ের তথ্য দিতে হয়

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় শুধু একজন করদাতার আয়, সম্পদ ও করের হিসাব দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সারা বছরে জীবনযাপনের পেছনে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তারও হিসাব দিতে হয়। পরিবারের খাবার ও পোশাক থেকে শুরু করে বাসা, যাতায়াত, শিক্ষা, ভ্রমণ, উৎসব এবং ব্যক্তিগত ঋণের সুদ—জীবনযাত্রার বিভিন্ন খাতে করা ব্যয়ের তথ্য রিটার্নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিবরণীতে উল্লেখ করার বিধান রয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত আইটি-১০বিবি (২০২৩) ফরমে জীবনযাত্রা-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের জন্য পৃথক ঘর রাখা হয়েছে। এতে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী, আবাসন, ব্যক্তিগত পরিবহন, ইউটিলিটি বিল, শিক্ষা, দেশ-বিদেশে ভ্রমণ, উৎসব ও বিশেষ ব্যয়, উৎসে কর্তিত বা সংগৃহীত কর এবং ব্যক্তিগত ঋণের সুদের মতো খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিবরণী নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী ব্যক্তিগত করদাতার জন্য বাধ্যতামূলক। বর্তমান আইনে সংশ্লিষ্ট আয় বছরে আয় পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলে, মোটরযানের মালিকানা অর্জন করলে, ব্যবসা থেকে আয় থাকলে, কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক হলে অথবা সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগ করলে এ বিবরণী দাখিল করতে হয়। এ ছাড়া কর কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে নোটিশের মাধ্যমেও কোনো ব্যক্তিকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিবরণী দিতে বলতে পারেন।

জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাব নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো একজন করদাতার ঘোষিত আয়, সম্পদ ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা। কারণ একজন ব্যক্তি রিটার্নে যে আয় দেখাচ্ছেন, তার জীবনযাত্রার ব্যয় যদি সেই আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়, তাহলে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একইভাবে কোনো ব্যয় পরিবারের অন্য সদস্য বহন করলে সেটিও প্রয়োজন অনুযায়ী মন্তব্যের ঘরে উল্লেখ করা যায়।

পরিবারের দৈনন্দিন ভরণপোষণ এ বিবরণীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাজার-সদাই, খাবার, পোশাক এবং পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে সারা বছরে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার হিসাব দিতে হয়। এখানে মাসিক খরচের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট আয় বছরে মোট ব্যয়ের পরিমাণ বিবেচনা করা হয়। ফলে সারা বছর বিভিন্ন খাতে করা ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করলে রিটার্ন তৈরির সময় সঠিক তথ্য দেওয়া সহজ হয়।

বাসস্থানের খরচও গুরুত্বপূর্ণ। বাসাভাড়া দেওয়া হলে বছরে মোট কত টাকা ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে, তার হিসাব রাখতে হয়। একই সঙ্গে বাসার রক্ষণাবেক্ষণ বা আবাসন-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় থাকলে সেগুলোর হিসাবও বিবেচনায় আসতে পারে। একজন করদাতার আয় এবং আবাসন ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তিগত পরিবহনের ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা হিসাব। গাড়ি বা মোটরসাইকেল ব্যবহারের পেছনে জ্বালানি, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন ফি এবং চালকের বেতনসহ যে ব্যয় হয়েছে, তার বার্ষিক হিসাব দিতে হয়। বিশেষ করে মোটরযানের মালিকানা থাকলে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিবরণী দাখিলের বিষয়টি আইনেই আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোন, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মতো নিয়মিত ইউটিলিটি বিলও জীবনযাত্রার ব্যয়ের অংশ। অনেক করদাতা মাসে মাসে এসব বিল পরিশোধ করলেও বছর শেষে মোট ব্যয়ের হিসাব আলাদাভাবে সংরক্ষণ করেন না। ফলে রিটার্ন তৈরির সময় সঠিক অঙ্ক নির্ধারণে সমস্যা হতে পারে। তাই বছরজুড়ে এসব বিলের তথ্য সংরক্ষণ করা করদাতার জন্য সুবিধাজনক।

সন্তানদের শিক্ষা ব্যয়ের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল, কলেজ বা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি, কোচিং, বইপত্র এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে বছরে মোট কত টাকা খরচ হয়েছে, তা বিবরণীতে প্রতিফলিত হতে পারে। বিশেষ করে একজন করদাতার ঘোষিত আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে।

দেশের ভেতরে কিংবা বিদেশে ভ্রমণের খরচও এ বিবরণীর আওতায় রয়েছে। ব্যক্তিগত ভ্রমণ, ছুটি কাটানো কিংবা অন্যান্য ভ্রমণ বাবদ ব্যয় হলে তার হিসাব রাখতে হয়। এসব ব্যয় ব্যাংক বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করা হলেও সংশ্লিষ্ট লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণ করা ভালো। কারণ আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে রিটার্নে প্রদর্শিত আয় ও ব্যয়ের সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ।

ঈদ, পূজা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব উপলক্ষে করা ব্যয়ের হিসাবও বিবেচনায় আসে। নতুন পোশাক কেনা, বিশেষ বাজার, পরিবারের সদস্যদের জন্য উপহার, আত্মীয়স্বজনকে অর্থ দেওয়া কিংবা অন্যান্য বিশেষ উপলক্ষে ব্যয়—এসব খাতের মোট ব্যয় বছর শেষে হিসাব করে রাখা প্রয়োজন। বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে তুলনামূলক বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলে সেটির যথাযথ হিসাব রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

করদাতার নিজের পরিশোধ করা বিভিন্ন করের তথ্যও বিবরণীতে যুক্ত হতে পারে। বছরজুড়ে উৎসে কর্তিত বা সংগৃহীত কর, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর্তিত কর এবং আগের বছরের রিটার্নের ভিত্তিতে পরিশোধ করা আয়কর ও সারচার্জের হিসাব সংরক্ষণ করতে হয়। রিটার্ন প্রস্তুতের সময় এসব তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র বা প্রমাণপত্র মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।

ব্যক্তিগত ঋণের সুদের বিষয়টিও বাদ দেওয়া যায় না। কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো উৎস থেকে ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে থাকলে সেই ঋণের বিপরীতে বছরে কত টাকা সুদ পরিশোধ করা হয়েছে, তার হিসাব জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিবরণীতে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

আয়কর রিটার্নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সম্পদ, দায় ও ব্যয়ের সামগ্রিক হিসাব। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী করদাতাদের ক্ষেত্রে সম্পদ ও দায়ের বিবরণও দিতে হয়। সেখানে রিটার্নে প্রদর্শিত আয়, করমুক্ত আয়, উপহার বা অন্যান্য অর্থপ্রাপ্তির মতো উৎসের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অন্যান্য ব্যয়ের সম্পর্ক দেখানো হয়। অর্থাৎ একজন করদাতার অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং কীভাবে ব্যয় বা সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে—সামগ্রিক আর্থিক চিত্রটি বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।

এ কারণে আয়কর রিটার্ন তৈরির কাজকে শুধু করের অঙ্ক নির্ধারণের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একজন করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়—সবকিছুর মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ। রিটার্নে ভুল বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দিলে পরবর্তী সময়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত রিটার্ন ফরমে জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য যে আলাদা কাঠামো রাখা হয়েছে, তা করদাতাকে সারা বছরের ব্যয়ের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে কর কর্তৃপক্ষের জন্যও একজন ব্যক্তির ঘোষিত আয় ও বাস্তব জীবনযাত্রার মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাইয়ের একটি কাঠামো তৈরি হয়।

তাই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে শুধু বেতন, ব্যবসা, ভাড়া বা অন্যান্য আয়ের হিসাব করলেই হবে না। বছরজুড়ে পরিবার পরিচালনা, বাসস্থান, পরিবহন, ইউটিলিটি, শিক্ষা, ভ্রমণ, উৎসব, কর ও ঋণের সুদসহ প্রযোজ্য ব্যয়ের হিসাবও গুছিয়ে রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিবরণী আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক, তাদের উচিত রিটার্ন তৈরির আগেই সংশ্লিষ্ট সব তথ্য ও নথি যাচাই করা।

সঠিক তথ্য, যথাযথ হিসাব এবং আয়-ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য—একটি নির্ভুল আয়কর রিটার্নের জন্য এই তিনটি বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ম মেনে তথ্য সংরক্ষণ করলে রিটার্ন দাখিলের সময় যেমন জটিলতা কমে, তেমনি ভবিষ্যতে কর কর্তৃপক্ষের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও সহজ হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত