পল্লবীতে বাড়ছে অপরাধ, বাড়ছে জনমনে আতঙ্ক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
পল্লবীতে বাড়ছে অপরাধ, বাড়ছে জনমনে আতঙ্ক

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর একসময়ের তুলনামূলক শান্ত আবাসিক এলাকা পল্লবীতে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক অপরাধের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ। খুন, গুলি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, অস্ত্রের প্রদর্শন এবং কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের নানা ঘটনা সামনে আসায় এলাকাটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সঙ্গে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতিকে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমছে। বরং একই এলাকায় মাদক, অর্থ, অস্ত্র ও প্রভাব বিস্তারের যোগসূত্রে একটি অপরাধচক্র গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ কারণেই অনেকে পল্লবীর বর্তমান পরিস্থিতিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের অতীতের অপরাধচিত্রের সঙ্গে তুলনা করছেন।

গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুর বাংলা স্কুল এলাকার মেট্রোরেলের ২২২ নম্বর পিলারের কাছে একটি অটোরিকশা থেকে জিম্মি অবস্থায় অর্ক নামে এক কিশোরকে উদ্ধার করে পল্লবী ট্রাফিক জোনের পুলিশ। এ ঘটনায় মোহাম্মদ রাব্বি নামে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণকে আটক করা হলেও আরও তিনজন পালিয়ে যায়। পুলিশ জানায়, দায়িত্ব পালনকালে সন্দেহ হওয়ায় অটোরিকশাটি থামানোর পর ভেতর থেকে ওই কিশোরকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি পল্লবী ও আশপাশের এলাকায় ছিনতাইকারীদের সক্রিয়তার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।

এর আগে গত ১৭ এপ্রিল পল্লবীর একটি বাসা থেকে ফিরোজা খানম ওরফে জোছনা নামের ৬৮ বছর বয়সী এক স্কুলশিক্ষিকার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, তাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছিল। ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এর মাত্র এক মাস পর ১৯ মে পল্লবীতে এক শিশুকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় পুলিশ প্রধান অভিযুক্তসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছে।

পল্লবীর অপরাধচিত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো কিশোর গ্যাং। ঢাকা মহানগর পুলিশের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ১১৮টি। এর মধ্যে মিরপুর বিভাগে রয়েছে ৩২টি গ্রুপ। শুধু পল্লবী থানার এলাকাতেই ১৪টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তুলনায় তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর থানায় রয়েছে ১৬টি গ্রুপ। এই পরিসংখ্যানই পল্লবীকে ঘিরে উদ্বেগের মাত্রা বোঝাতে যথেষ্ট বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পল্লবীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানও হয়েছে। ‘ভইরা দে’ নামে পরিচিত একটি গ্যাংয়ের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, অস্ত্র প্রদর্শন ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র প্রদর্শনের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমেও তারা এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করত বলে অভিযোগ রয়েছে।

মাদক কারবারও পল্লবীর অপরাধ পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। পুলিশের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, পল্লবী থানা এলাকায় মাদক কারবারের ১৭টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেখানে ১৭ জনকে প্রধান কারবারি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে শতাধিক খুচরা বিক্রেতা কাজ করে বলে পুলিশের তথ্যের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মিল্লাত ক্যাম্পসহ কয়েকটি এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময়ে ইয়াবাসহ বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। তবে সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গ্রেপ্তার হওয়া অনেকেই জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

গত ৭ আগস্ট পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়। ওই ঘটনায় বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনসহ এক পথচারী নারী গুলিবিদ্ধ হন। পরে ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে রুবেল ওরফে ‘ল্যাংড়া রুবেল’সহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, ম্যাগাজিন ও ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানানো হয়। পুলিশের তদন্তে মাদক কারবারের অর্থ ভাগাভাগি ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে হামলার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে আনা হয়।

‘ল্যাংড়া রুবেল’কে ঘিরে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে পল্লবীর অপরাধজগতের একটি দীর্ঘ ধারাবাহিকতার চিত্র পাওয়া যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ছোটখাটো চুরি ও ছিনতাই দিয়ে অপরাধজগতে প্রবেশের পর তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসহ একাধিক মামলা হয়। পরবর্তী সময়ে মাদক কারবার ও অপরাধীচক্রের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসে। এ ধরনের অপরাধীদের উত্থান দেখিয়ে দেয়, ছোট অপরাধকে শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা পরবর্তী সময়ে বড় অপরাধের নেটওয়ার্কে পরিণত হতে পারে।

পল্লবীতে চাঁদাবাজির অভিযোগও নতুন নয়। গত ২২ জুলাই বাউনিয়াবাদ মসজিদ মার্কেট এলাকায় অস্ত্র ও ধারালো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করার অভিযোগ ওঠে। বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনাবেচা ও ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও বাড়ছে। গত ১০ জুন পল্লবীর ১২ নম্বর সেকশনের একটি এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে। এতে একজন গুলিবিদ্ধ হন এবং একজনকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। পরে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে একাধিক মামলার আসামি ‘টান আকাশ’কে গ্রেপ্তার করে। এসব ঘটনায় স্পষ্ট হয়, অপরাধচক্রগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা কখনো কখনো প্রকাশ্য সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।

গত ২৯ আগস্ট বিহারি ক্যাম্প এলাকায় একটি স্থাপনা নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, গুলির শব্দ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। যদিও ঘটনাটির সঙ্গে মাদকচক্রের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য নিশ্চিত নয়, তবু সামান্য বিরোধ কীভাবে দ্রুত বড় ধরনের সংঘাতে পরিণত হতে পারে, সেটিও এ ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে।

পল্লবীর এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অপরাধীদের আধিপত্যের লড়াইয়ে নিরীহ পথচারী বা বাসিন্দার প্রাণহানি নতুন নয়। এর আগে মাদক কারবারিদের দুই পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে আয়েশা আক্তার নামে এক নারী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এমন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে যে, অনেকেই সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় চলাচল এড়িয়ে চলেন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পল্লবীর সমস্যাকে শুধু গ্রেপ্তার অভিযান দিয়ে স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। মাদকের অর্থের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ এবং অপরাধীচক্রের পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পল্লবীকে ‘আরেক মোহাম্মদপুর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা এখনই হয়তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তবে খুন, গুলি, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনাগুলো যদি একই ধারায় চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান যেমন প্রয়োজন, তেমনি গ্রেপ্তারের পর বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং জামিনে বেরিয়ে আসা অপরাধীদের ওপর নজরদারিও জরুরি।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজধানীর যেসব এলাকায় অপরাধের ঘটনা ঘটছে, সেখানে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। অপরাধ করে কেউ ছাড় পাবে না—এমন অবস্থানের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

তবে পল্লবীর প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে শুধু অভিযান আর গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। অপরাধের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করা, মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং কিশোরদের অপরাধচক্র থেকে দূরে রাখার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে একের পর এক গ্রেপ্তার হলেও নতুন মুখ সামনে আসবে, আর পল্লবীর অলিগলিতে অপরাধের ছায়া আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত