কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ছাড়ল বিরোধীদল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ছাড়ল বিরোধীদল

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তিনটি বিল পাসের প্রতিবাদে জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। অধিবেশন বর্জনের পর মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগ করেন তারা। এ সময় সংসদে বিরোধী মতামত উপেক্ষা করা, স্পিকারের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং কয়েকটি আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় নেতারা।

রোববার রাতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন চলছিল। আলোচনার একপর্যায়ে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল’ পাসের বিষয়টি সামনে আসে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা এসব বিলের বিভিন্ন বিধান নিয়ে আপত্তি জানান। তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এসব আইন নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা এবং বিরোধী পক্ষের মতামত বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ দলটির সংসদ সদস্যরা অধিবেশন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। তারা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সংসদ ভবনের টানেলে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানেই তারা মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ জানান।

বিরোধীদলীয় নেতারা ৬ সেপ্টেম্বরকে সংসদের জন্য ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের বক্তব্য, সংসদে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি বিরোধী মতামত শোনা এবং যথাযথ সংসদীয় বিতর্কের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু আলোচ্য তিনটি বিলের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চাইলেও তাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে স্পিকার মশকরা করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। নাহিদ ইসলামের ভাষায়, সংসদের স্পিকারের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয় এবং এতে সংসদের নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিরোধীদলের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়েই সরকার দ্রুততার সঙ্গে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল সংসদে উত্থাপন ও পাস করেছে। এসব আইনের কিছু বিধান নিয়ে বিরোধীদলের গুরুতর আপত্তি রয়েছে বলেও জানান তিনি।

নাহিদ ইসলামের দাবি, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগের তদন্তে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নতুন আইনে তদন্তের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ও কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, মানবাধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত আইন যদি তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে যথেষ্ট স্বাধীনতা না দেয়, তাহলে সেই আইন কার্যকরভাবে মানুষের অধিকার রক্ষা করতে পারবে না।

অন্যদিকে, সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে ভিন্ন ধরনের আপত্তি তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় মুখপাত্র নজিবুর রহমান। তিনি বিলটির কয়েকটি বিধানকে ইসলামী বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেন। তার বক্তব্য, কোরআন ও সুন্নাহর নির্ধারিত উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন বিধানগুলোর সামঞ্জস্য নিয়ে সংসদে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি।

নজিবুর রহমান আইনমন্ত্রীর বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ইসলামী বিধান সম্পর্কে যথাযথ ধারণা না থাকায় সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত বিষয় সংসদে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি বলেন, ধর্মীয় ও পারিবারিক সম্পত্তির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আইন প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্পিকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের এই নেতা। তার দাবি, সংসদে স্পিকারের প্রধান দায়িত্ব হলো সব দলের জন্য ন্যায়সংগত ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু আলোচ্য অধিবেশনে সেই নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়নি। বিরোধীদলের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতাদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন। তাদের বক্তব্য, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এমন কাঠামো থাকা উচিত, যাতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ পান এবং তদন্ত কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়।

তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আইন যদি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে যথেষ্ট শক্তিশালী না করে, তাহলে ভবিষ্যতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার পাওয়া কঠিন হতে পারে। এ কারণে তারা সংসদে বিলগুলো নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা ও সংশোধনের দাবি জানান।

কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগের ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণত সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধীদলের ওয়াকআউট একটি প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিবাদ পদ্ধতি হলেও মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগের মাধ্যমে বিরোধীদল তাদের প্রতিবাদের তীব্রতা প্রকাশ করেছে।

সংসদের ভেতরে সরকারের সঙ্গে বিরোধীদলের মতপার্থক্য থাকলেও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মানবাধিকার, নিখোঁজ ব্যক্তি, সম্পত্তি ও নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত আইন সাধারণ মানুষের জীবন ও অধিকারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আইনের বাস্তব প্রয়োগ, সাংবিধানিক সামঞ্জস্য এবং নাগরিক স্বার্থও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

বিরোধীদলের অভিযোগগুলোর বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে বিলগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি এবং বিরোধীদলের আপত্তি—দুই পক্ষের অবস্থানই সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা। তবে বিরোধীদলের অভিযোগ, সেই সুযোগ পর্যাপ্তভাবে দেওয়া হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, সংসদ কার্যকর রাখতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পাশাপাশি বিরোধীদলের মতামত প্রকাশের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিরোধী দলের প্রশ্ন, আপত্তি ও বিকল্প প্রস্তাব আইনটির দুর্বলতা চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একইভাবে সরকারের দায়িত্ব হলো সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতা প্রয়োগের পাশাপাশি ভিন্নমতকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা।

রোববারের ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে সেই রাজনৈতিক টানাপোড়েনই প্রকাশ্যে এসেছে। মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন ত্যাগের দৃশ্য কেবল একটি দিনের সংসদীয় প্রতিবাদ নয়; বরং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া, বিরোধী দলের অধিকার এবং স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিরোধীদল তাদের আপত্তি সংসদের ভেতরে এবং বাইরে তুলে ধরেছে। এখন এসব অভিযোগের রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর কার্যকারিতা, সাংবিধানিক ভিত্তি এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় বাস্তব ভূমিকা কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে শেষ পর্যন্ত জনগণের অধিকার, আইনের শাসন এবং কার্যকর জবাবদিহিই হওয়া উচিত আইন প্রণয়নের প্রধান মানদণ্ড।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত