সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রী-হুইপ, স্পিকারের উষ্মা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৪ বার
সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রী-হুইপ, স্পিকারের উষ্মা

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদের একাধিক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সদস্য পদে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সংসদে উষ্মা প্রকাশ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সংসদীয় কমিটির কার্যক্রমে বেসরকারি সদস্যদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার যে প্রচলিত রীতি রয়েছে, তা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কমিটি গঠনের সময় বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিকে অনুরোধ করেছেন স্পিকার।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের বৈঠকে পাঁচটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন এবং দুটি কমিটি পুনর্গঠনের পর এ নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন স্পিকার। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি কমিটিগুলোর গঠনসংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে অনুমোদিত হয়। এরপর কমিটিগুলোতে সরকারি দায়িত্বে থাকা কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি স্পিকারের নজরে আসে।

স্পিকার বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা, জবাবদিহি নিশ্চিত এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করা। এ ব্যবস্থায় কমিটির সভাপতি সাধারণত বেসরকারি সদস্য বা সাধারণ সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে হওয়ার কথা। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা নিজেদের মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন। কিন্তু অন্য কমিটিতে তাদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সংসদের প্রচলিত রীতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

এবারের কমিটি গঠনে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাধারী চারজন সরকারি হুইপকে চারটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপনকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

নতুন দায়িত্ব পাওয়া চার হুইপের মধ্যে রকিবুল ইসলাম বকুলকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়াকে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন হুইপ জি কে গউছ।

সংসদীয় কার্যক্রমে হুইপদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা সরকারি দলের সংসদীয় কার্যক্রম সমন্বয়, সংসদে দলীয় অবস্থান বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। আবার বর্তমান সংসদে কয়েকজন হুইপ প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাও ভোগ করছেন। ফলে একই ব্যক্তি যখন সংসদীয় কমিটির সভাপতি হন, তখন কমিটির স্বাধীনভাবে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভারসাম্যের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। স্পিকারের বক্তব্যের মূল উদ্বেগও এ জায়গাতেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ তদারকি ও পর্যালোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সাধারণভাবে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, আইন বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন নীতি ও প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে পারে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্যও চাইতে পারে কমিটি। ফলে এসব কমিটির নেতৃত্বে কে থাকছেন, তা সংসদীয় জবাবদিহির দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণেই কমিটির সভাপতি পদে মন্ত্রী বা সরকারি নির্বাহী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিয়ে স্পিকারের মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংসদীয় কমিটি যদি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে, তাহলে সেই কমিটির নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী দায়িত্বের সম্পর্ক থাকলে ভূমিকার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে স্পিকারও বলেছেন, উচ্চপদস্থ বা সরকারি সুযোগ-সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের কমিটিতে রাখা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ নয়। তার আপত্তির জায়গা মূলত সংসদের প্রচলিত রীতি ও কমিটি গঠনের কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যকে ঘিরে।

এদিকে মঙ্গলবার গঠিত পাঁচটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহজাহানকে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন এ কে এম ফজলুল হক মিলন। রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন মোহাম্মদ আলী আসগার লবি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে এস এম রফিকুল ইসলামকে।

এর আগে জাতীয় সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কার্যপ্রণালি-বিধি অনুসরণ করে একাধিক স্থায়ী ও বিষয়ভিত্তিক কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কমিটিগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ কাঠামো পাচ্ছে। সংসদের মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এবং ১১টি বিষয়ভিত্তিক কমিটি রয়েছে। এখন পর্যন্ত এসবের বড় একটি অংশ গঠিত হয়েছে।

কমিটি গঠনের এই পর্যায়ে স্পিকারের বক্তব্য সংসদীয় কার্যক্রমে প্রচলিত রীতিনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে স্থায়ী কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে হলে শুধু কমিটি গঠন করাই যথেষ্ট নয়; বরং সদস্যদের ভূমিকা, সভাপতির স্বাধীনতা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওপর কার্যকর নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ।

স্পিকার যে বিষয়টি সামনে এনেছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে সংসদীয় কমিটির কাঠামোগত স্বাধীনতা ও জবাবদিহি। সরকারের নির্বাহী শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাধারণ সংসদ সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে কমিটিগুলো আরও কার্যকরভাবে মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা করতে পারবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে সংসদীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

চিফ হুইপকে ভবিষ্যতে কমিটি গঠনের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার কার্যত সংসদের প্রচলিত রীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এখন পরবর্তী সময়ে গঠিতব্য কমিটিগুলোতে এই নির্দেশনা কতটা প্রতিফলিত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে। একই সঙ্গে বর্তমান কমিটিগুলো বাস্তবে মন্ত্রণালয়ের কাজের ওপর কতটা কার্যকর নজরদারি করতে পারে, সেটিও হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংসদীয় কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জায়গা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত