নাশকতার সন্দেহে নেদারল্যান্ডসে রেল চলাচলে বিপর্যয়

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩০ বার
নাশকতার সন্দেহে নেদারল্যান্ডসে রেল চলাচলে বিপর্যয়

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেদারল্যান্ডসে রেললাইনে ইচ্ছাকৃতভাবে পাইপ ও তার ফেলে রাখার ঘটনায় দেশটির রেল যোগাযোগে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। রাজধানী আমস্টারডামসহ মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মঙ্গলবার সকালে একের পর এক এমন ঘটনা শনাক্ত হওয়ার পর বহু ট্রেন বাতিল ও বিলম্বিত হয়। রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান প্রোরেল জানিয়েছে, ৩৫টির বেশি স্থানে রেললাইনের ওপর বিভিন্ন ধরনের বস্তু পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘটনাগুলোর পেছনে কারা রয়েছে কিংবা তাদের উদ্দেশ্য কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি তদন্তে পুলিশ মাঠে নেমেছে। তদন্তের সঙ্গে সরকারি প্রসিকিউটরের দপ্তর এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা এআইভিডিও যুক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মকাণ্ড, সংগঠিত নাশকতা নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে—তা নিয়ে তদন্তকারীদের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে একসঙ্গে বিভিন্ন রেলপথে সমস্যা দেখা দেওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। আমস্টারডাম, দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্কিপহল, আইন্দহোভেন ও উটরেখটের সঙ্গে যোগাযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ অথবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অনেক যাত্রী নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। কিছু রেলক্রসিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রেল যোগাযোগের পাশাপাশি সড়ক চলাচলেও সাময়িক প্রভাব পড়ে।

প্রোরেলের কর্মকর্তারা জানান, রেললাইনে পড়ে থাকা পাইপ ও তার শুধু ট্রেনের জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করেনি, বরং রেলপথের স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাতেও সমস্যা সৃষ্টি করেছে। লাইনের ওপর পড়ে থাকা বস্তুগুলো রেল ব্যবস্থার কম্পিউটারকে এমন সংকেত দিচ্ছিল যে ওই অংশে ট্রেন অবস্থান করছে। ফলে নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট রেললাইনকে ট্রেন চলাচলের জন্য খালি হিসেবে দেখানো সম্ভব হচ্ছিল না। নিরাপত্তার কারণে তখন ট্রেন চলাচল বন্ধ বা সীমিত করা ছাড়া কর্তৃপক্ষের সামনে অন্য কোনো সহজ বিকল্প ছিল না।

রেললাইনে এ ধরনের বস্তু রেখে যাওয়াকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছে প্রোরেল। কারণ দ্রুতগতির ট্রেনের সামনে হঠাৎ কোনো ধাতব বস্তু, পাইপ কিংবা তার পড়ে থাকলে তা সংঘর্ষের কারণ হতে পারে। এতে ট্রেনের যাত্রী, চালক এবং রেল অবকাঠামো—সবকিছুর ওপরই গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মঙ্গলবারের ঘটনায় বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

এর আগে সোমবার ভোরেও একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটে দেশটির পূর্বাঞ্চলের স্টেইনভাইকের কাছে। সেখানে একটি ট্রেন রেললাইনে পড়ে থাকা ধাতব বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। প্রোরেলের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ট্রেনটি পূর্ণ গতিতে চলছিল না। ফলে সংঘর্ষ হলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে এই ঘটনার পর পরদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের একাধিক বস্তু রেললাইনে পাওয়া যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও গুরুত্ব পায়।

নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব ইয়েটেন ঘটনাগুলোকে বড় ধরনের পরিবহন বিঘ্ন হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং এগুলো মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারত বলে মন্তব্য করেছেন। রেল যোগাযোগ দেশটির দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো রেলপথে সমস্যা দেখা দেওয়ায় প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ট্রেন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নেদারল্যান্ডসে স্পোরভেগেন জানিয়েছে, একই সময়ে এত বেশি রেলপথে সমস্যা তৈরি হয়েছিল যে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প বাসসেবা দেওয়াও সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক যাত্রীকে স্টেশনেই অপেক্ষা করতে হয়েছে অথবা নিজেদের উদ্যোগে বিকল্প পরিবহন খুঁজতে হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ শহর ও বিমানবন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং দূরপাল্লার যাত্রীদের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।

প্রোরেল জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুর ১টার পর নতুন করে কোনো রেলপথ বন্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে আগের অধিকাংশ বাধা সরিয়ে নেওয়া হয় এবং রেল চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে স্পোরভেগেনের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা পর্যন্ত দুটি রেলপথে কিছু সমস্যা অব্যাহত ছিল। ফলে সব রুটে ট্রেন চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগে।

এই ঘটনার তদন্তের পাশাপাশি রেল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের স্পোরভেগেনের অন্তর্বর্তী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিরিয়াম ভান ফেলটহাউজেন বলেন, মঙ্গলবারের ঘটনাগুলো দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্পষ্ট করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রেল অবকাঠামো ও পরিচালনাব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকা পরিস্থিতিতে রেলব্যবস্থাকে বিভিন্ন ধরনের বিঘ্ন মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে। একই সঙ্গে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব যতটা সম্ভব কমিয়ে দ্রুত রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। কারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে সমস্যা তৈরি হলে তা খুব দ্রুত অন্য রুট ও বিপুলসংখ্যক যাত্রীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

মঙ্গলবার নেদারল্যান্ডসে ছিল ‘প্রিন্সিয়েসডাগ’, যেদিন দেশটির সরকার সাধারণত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করে। একই দিনে দেশটির বিভিন্ন সড়কের পাশে খড়ের গাদায় আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষাকারী সংগঠন ফার্মার্স ডিফেন্স ফোর্স আগে থেকেই বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছিল। কৃষি খাত থেকে নাইট্রোজেন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে সরকারের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে সংগঠনটি।

এই পরিস্থিতির কারণে রেললাইনে নাশকতার ঘটনাগুলোর সঙ্গে কৃষক বিক্ষোভের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ এমন কোনো সম্পর্কের প্রমাণ পায়নি। ফার্মার্স ডিফেন্স ফোর্সও রেললাইনে পাইপ ও তার রেখে যাওয়ার ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে। সংগঠনটি অবশ্য বলেছে, কোনো কোনো কৃষক ব্যক্তিগতভাবে এমন ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন কি না, সেই সম্ভাবনা তারা পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারছে না। বিষয়টি এখন তদন্তকারীদের যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করছে।

নেদারল্যান্ডসের পুলিশ জানিয়েছে, রেললাইনে বস্তু ফেলে রাখার ঘটনাগুলোর তদন্তে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পুলিশ সদস্যদের কাজে নামানো হয়েছে। ঘটনাস্থলগুলো থেকে কী ধরনের আলামত পাওয়া গেছে এবং এগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শী, নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত তদন্তে কাজে লাগানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এদিকে নেদারল্যান্ডসের ঘটনার পাশাপাশি ফ্রান্সে একটি পৃথক ট্রেন দুর্ঘটনাকে ঘিরেও নাশকতার সম্ভাবনা নিয়ে তদন্ত চলছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ অবশ্য তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সতর্ক করেছে। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক রেল নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে নেদারল্যান্ডসের ঘটনাও নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে নেদারল্যান্ডসের রেললাইনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। পাইপ ও তার ইচ্ছাকৃতভাবে রাখা হয়েছিল—এমন প্রাথমিক সন্দেহ থাকলেও এর পেছনে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করেনি।

সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, এতগুলো রেলপথে একযোগে বিঘ্ন ঘটলেও মঙ্গলবার বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে দ্রুতগতির রেলব্যবস্থায় এ ধরনের ঘটনা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা সোমবারের ধাতব বস্তুর সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষের ঘটনাই মনে করিয়ে দিয়েছে। এখন তদন্তকারীদের প্রধান লক্ষ্য হলো ঘটনার নেপথ্যে থাকা কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে রেল নিরাপত্তা আরও জোরদার করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত