প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাউদাম্পটনের আকাশে যখন টি-টোয়েন্টির উত্তাপ, তখন ব্যাট হাতে যেন ঝড় তুললেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। তার বিধ্বংসী অপরাজিত সেঞ্চুরির ওপর ভর করে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে রানের পাহাড় গড়েছে স্বাগতিকরা। পরে বল হাতে শ্রীলঙ্কাকে দ্রুত চাপে ফেলে বড় ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে সিরিজের শুরুটাই নিজেদের করে নিয়েছে ইংল্যান্ড।
সাউদাম্পটনে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নামা ইংল্যান্ড নির্ধারিত ২০ ওভারে চার উইকেট হারিয়ে সংগ্রহ করে ২৫৪ রান। জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে শ্রীলঙ্কার ইনিংস থামে মাত্র ১৩৫ রানে। ফলে ১১৯ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় পায় ইংল্যান্ড। ম্যাচজুড়ে ব্যাটিংয়ের আগ্রাসন এবং পরে বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সের সামনে লঙ্কানদের লড়াই কার্যত একতরফা হয়ে পড়ে।
শুরু থেকেই ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা যে বড় সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন, তা পাওয়ার প্লেতেই স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রথম ছয় ওভারে মাত্র একটি উইকেট হারিয়ে ৯০ রান তুলে নেয় স্বাগতিকরা। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুত রান তোলার যে পরিকল্পনা ইংল্যান্ডের, সেটিই ম্যাচের শুরুতে শ্রীলঙ্কার বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করে।
পাওয়ার প্লের পর ইংল্যান্ডের ইনিংস আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক এবং জস বাটলার একসঙ্গে ক্রিজে থাকার সময় রান তোলার গতি আরও বাড়িয়ে দেন। মাত্র ৬০ বলে এই দুই ব্যাটার মিলে গড়েন ১২৮ রানের দুর্দান্ত জুটি। শ্রীলঙ্কার বোলারদের বিপক্ষে একের পর এক আক্রমণাত্মক শট খেলতে থাকেন তারা।
বাটলার নিজের ইনিংসে ৪৪ বলে ৮টি চার ও ৩টি ছক্কা মেরে করেন ৮০ রান। তার ব্যাটিংয়ে যেমন ছিল অভিজ্ঞতার ছাপ, তেমনি ছিল টি-টোয়েন্টির স্বাভাবিক আগ্রাসন। ইংল্যান্ডের বড় সংগ্রহের ভিত শক্ত করে দিয়ে তিনি যখন বিদায় নেন, তখনও ক্রিজে ছিলেন ব্রুক। এরপর অধিনায়ক একাই ইনিংসের গতি ধরে রাখেন।
ব্রুকের ব্যাটিং ছিল ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্য। মাত্র ৪৯ বলে শতরান পূর্ণ করেন ইংলিশ অধিনায়ক। শেষ পর্যন্ত ১১৪ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন তিনি। ১০টি চার ও ৬টি ছক্কায় সাজানো তার ইনিংসটি ছিল শক্তি, টাইমিং ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সমন্বয়ে তৈরি। ইনিংসের শেষ পর্যন্ত ক্রিজে থেকে দলকে ২৫০ রানের সীমা পেরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ইংল্যান্ডের অন্য ব্যাটারদের মধ্যে উইল জ্যাকস করেন ২১ রান এবং টম ব্যান্টনের ব্যাট থেকে আসে ১০ রান। বাটলার ও ব্রুকের বড় জুটির পর শেষ দিকে রান বাড়ানোর দায়িত্বও স্বাগতিক ব্যাটাররা কার্যকরভাবে পালন করেন। এর ফলেই ২০ ওভার শেষে স্কোরবোর্ডে ওঠে ২৫৪ রান।
এত বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শ্রীলঙ্কার সামনে শুরু থেকেই কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। ইংল্যান্ডের বোলাররা নতুন বল হাতে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার আগেই তিনটি উইকেট হারিয়ে বসে লঙ্কানরা। দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারানোর পর প্রয়োজনীয় রানরেটের চাপও বাড়তে থাকে।
শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং লাইনআপে বড় কোনো জুটি তৈরি না হওয়ায় ম্যাচে ফেরার সুযোগ ক্রমেই কমে যায়। দুনিথ ভেল্লালাগে ৩৩ রান এবং দাসুন শানাকা ২৪ রান করে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের ইনিংসও প্রয়োজনীয় গতি তৈরি করতে পারেনি। দলের অন্য কোনো ব্যাটার দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পারেননি।
এক পর্যায়ে শ্রীলঙ্কার ব্যাটারদের জন্য লক্ষ্যটা শুধু কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোর কারণে রান তাড়ার চাপ সামলাতে পারেনি তারা। শেষ পর্যন্ত ১৯ ওভারের আগেই ১৩৫ রানে গুটিয়ে যায় শ্রীলঙ্কার ইনিংস। ইংল্যান্ড জয় পায় ১১৯ রানের ব্যবধানে।
ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণও ব্যাটারদের মতো কার্যকর ছিল। সনি বেকার তিনটি উইকেট নিয়ে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং ধস নামাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লিয়াম ডুসন ও জেমি ওভারটন নেন দুটি করে উইকেট। ইংল্যান্ডের আরও তিন বোলার একটি করে উইকেট তুলে নেন। ফলে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং অর্ডারকে পুরো ইনিংসজুড়েই চাপে রাখা সম্ভব হয়।
ম্যাচের ফলাফল শুধু ইংল্যান্ডের বড় জয়ই নয়, দলটির টি-টোয়েন্টি পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়নেরও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। প্রথমে ব্যাট করে পাওয়ার প্লেতে দ্রুত রান সংগ্রহ, এরপর বড় জুটি এবং শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরক ব্যাটিং—এই তিন ধাপে ২৫৪ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়ে ইংল্যান্ড। পরে বোলাররা শুরুতেই উইকেট তুলে নিয়ে শ্রীলঙ্কাকে সেই চাপ থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেননি।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার জন্য ম্যাচটি ছিল হতাশার। ২৫৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই তিন উইকেট হারানোর পর তাদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ ছিল ইনিংসকে স্থিতিশীল করা। কিন্তু মাঝের ওভারে প্রয়োজনীয় বড় জুটি না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। ভেল্লালাগে ও শানাকার চেষ্টা সত্ত্বেও দলের রান ১৫০-এর কাছাকাছিও পৌঁছায়নি।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি উইকেট ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ড যেখানে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেও বড় জুটি তৈরি করেছে, সেখানে শ্রীলঙ্কা শুরুতেই উইকেট হারিয়ে নিজেদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ফলে রান তাড়ার শেষভাগে প্রয়োজনীয় ব্যাটিং শক্তি আর অবশিষ্ট ছিল না।
হ্যারি ব্রুকের ১১৪ রানের অপরাজিত ইনিংস তাই ম্যাচের ফলাফলে সবচেয়ে বড় ব্যবধান তৈরি করেছে। অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি ব্যাট হাতে দলকে এমন জায়গায় পৌঁছে দেন, যেখান থেকে শ্রীলঙ্কার জন্য ম্যাচে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। তার দ্রুত সেঞ্চুরি ইংল্যান্ডের ইনিংসকে বিশেষ মাত্রা দেয়।
অন্যদিকে বাটলারের ৮০ রানও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্রুকের সঙ্গে তার ১২৮ রানের জুটি ইংল্যান্ডকে বড় সংগ্রহের পথে নিয়ে যায়। একসঙ্গে দুই অভিজ্ঞ ব্যাটারের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শ্রীলঙ্কার বোলিং পরিকল্পনাকে বারবার চাপে ফেলেছে।
প্রথম ম্যাচেই ১১৯ রানের জয় দিয়ে ইংল্যান্ড সিরিজে এগিয়ে গেল। সিরিজের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে শ্রীলঙ্কার সামনে থাকবে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ। প্রথম ম্যাচের ভুলগুলো কাটিয়ে উঠে ব্যাটিংয়ে স্থিতিশীলতা এবং বোলিংয়ে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। আর ইংল্যান্ড চাইবে প্রথম ম্যাচের আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে সিরিজের পরের ম্যাচগুলোতেও একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে।
সাউদাম্পটনের এই ম্যাচে তাই দুই দলের পারফরম্যান্সের পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। একদিকে ব্রুক-বাটলারের ব্যাটে ইংল্যান্ডের রানের বিস্ফোরণ, অন্যদিকে শুরুতেই উইকেট হারিয়ে শ্রীলঙ্কার রান তাড়া থমকে যাওয়া—এই দুই চিত্রই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। প্রথম টি-টোয়েন্টির ফল ইংল্যান্ডের পক্ষে গেলেও সিরিজের বাকি ম্যাচগুলোতে দুই দলের লড়াই কীভাবে বদলায়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের।