ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় বাড়ছে, অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৬ বার
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় বাড়ছে, অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত ক্রমেই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, ওয়াশিংটনের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনার ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। কংগ্রেসের নিরপেক্ষ বাজেট বিশ্লেষণকারী সংস্থা কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। সংঘাত অব্যাহত থাকলে প্রতি মাসে আরও প্রায় ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে বলে সিবিও জানিয়েছে।

এই ব্যয়ের বড় অংশই এসেছে ব্যবহৃত গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র পুনরায় সংগ্রহ, সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি, অতিরিক্ত বিমান পরিচালনা, জ্বালানি এবং যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রম থেকে। অর্থাৎ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়ের চাপও তত বাড়বে। সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে মাসিক ব্যয় ৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি যেতে পারে, আর তুলনামূলক কম মাত্রার সংঘাতে তা প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে থাকতে পারে বলে সিবিওর হিসাব।

তবে এই যুদ্ধের আর্থিক চাপের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ। সিবিওর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিপুল পরিমাণ প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করায় যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিভিন্ন মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত পুনরায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আনতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। একটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবস্থার মজুতের বড় অংশ ব্যবহৃত হয়েছে এবং তা পুনর্গঠনে অন্তত পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে যদি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ও দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্রের মজুত দীর্ঘ সময়ের জন্য কমে যায়, তাহলে একই সময়ে বিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক সংকট দেখা দিলে ওয়াশিংটনের হাতে কতটা অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকবে—এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে চীন ও তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উদ্বেগ উঠে এসেছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন অস্ত্রের সংকট নিয়ে ওঠা উদ্বেগের কিছু অংশ অস্বীকার করেছে। হোয়াইট হাউস ও প্রতিরক্ষা বিভাগের বক্তব্য হলো, প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ ও সামরিক প্রস্তুতি রয়েছে। ফলে একদিকে কংগ্রেসের বাজেট বিশ্লেষক ও প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিবেদনে মজুত কমে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে পেন্টাগন সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রকাশ্যে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে।

যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোর ওপরও পড়েছে। ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। পেন্টাগনের পরিদর্শক দপ্তরের এক হিসাব অনুযায়ী, জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংঘাত-সংশ্লিষ্ট ব্যয় প্রায় ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এতে সামরিক সরঞ্জাম ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও অন্যান্য যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ব্যয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই সংঘাতের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপ যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। সিবিওর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ ও জ্বালানি বাজারের প্রভাবের কারণে ২০২৭ সালের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি যুদ্ধ শুরুর আগে করা পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি হতে পারে।

মূল্যস্ফীতির এই সম্ভাব্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন থেকে শুরু করে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত খরচ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ের দামে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে যুদ্ধের ব্যয় শুধু মার্কিন সরকারের বাজেটেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর একটি অংশ অর্থনীতির বিভিন্ন স্তর দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও প্রতিফলিত হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণের চাপ। দেশটির সরকারি ঋণ ইতোমধ্যেই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক মাস ধরে চলা একটি বড় সামরিক সংঘাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে আরও কঠিন করে তুলছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অস্ত্র পুনরায় কেনা, ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক স্থাপনা মেরামত এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে।

মানবিক দিক থেকেও সংঘাতের মূল্য কম নয়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ১৮ সদস্য নিহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক স্থাপনা, বিমান ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব স্থানীয় জনগোষ্ঠী, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এখন কেবল দুই দেশের সামরিক শক্তির লড়াই হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে।

এদিকে সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হচ্ছে। যুদ্ধের ব্যয়, সামরিক প্রস্তুতি, কংগ্রেসের অনুমোদন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রেসিডেন্টের সামরিক পদক্ষেপ সীমিত করার উদ্দেশ্যে একটি যুদ্ধক্ষমতা-সংক্রান্ত প্রস্তাব ২২০-২০৪ ভোটে পাস হয়। এর আগে একই ধরনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব পদক্ষেপের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিণতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একসঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে সামরিক অভিযান পরিচালনার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে দীর্ঘ সময় লাগার আশঙ্কা রয়েছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং জাতীয় ঋণের বোঝার মধ্যে নতুন সামরিক ব্যয় যোগ হচ্ছে। যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে এসব চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই এখন ওয়াশিংটনের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত