ডিজেলের দাম বাড়ায় চাপে কৃষি, শঙ্কায় বোরো ধান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৯ বার
ডিজেলের দাম বাড়ায় চাপে কৃষি, শঙ্কায় বোরো ধান

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি আমন মৌসুমে সার সংকট, বাড়তি দামে কৃষি উপকরণ কেনা এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে এমনিতেই উৎপাদন ব্যয় নিয়ে চাপে রয়েছেন কৃষক। এর মধ্যেই ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামনে বোরো মৌসুম শুরু হতে যাওয়ায় সেচনির্ভর এই ফসলের উৎপাদন ব্যয় কতটা বাড়বে, তা নিয়ে কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা। কৃষিতে সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের মতো নানা কাজে ডিজেল ব্যবহৃত হওয়ায় জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় প্রতিটি ধাপেই পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন কৃষিকাজে ব্যবহার হয়। ফলে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব কৃষি খাতে পড়বে। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, আগের দামে কৃষকের বছরে ডিজেলে ব্যয় হতো প্রায় ১২ হাজার ৬ কোটি টাকা। প্রতি লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ায় সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা হতে পারে। অর্থাৎ কৃষকের বছরে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ হাজার ৮৮ কোটি টাকা।

বর্তমানে মাঠে রয়েছে আমন ধান। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটার প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ধান কাটা, মাড়াই এবং পরিবহনের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। আমন মৌসুমের শুরুতেই সার সংকট এবং বাড়তি দামে সার কেনার অভিযোগ ছিল বিভিন্ন এলাকায়। এর সঙ্গে বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এখন ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

নওগাঁর হোগলবাড়ী গ্রামের কৃষক মাহবুব তালুকদার জানান, এবার আমন চাষে অন্যান্য বছরের তুলনায় ব্যয় অনেক বেড়েছে। সার ও সেচের খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি এখন ধান মাড়াইয়ের ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, আমনেই যদি এত ব্যয় হয়, তাহলে বোরো মৌসুমে কী পরিস্থিতি হবে, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। এ কারণে সেচ কম লাগে এমন ফসল চাষের কথাও ভাবছেন তিনি।

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার কৃষক অজি উল্যাহর মতে, আমনের তুলনায় বোরো ধানে সেচের প্রয়োজন অনেক বেশি। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচের পাশাপাশি মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। এতে অনেক কৃষক বোরো চাষ থেকে সরে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কৃষক সিদ্দিক মিয়াও উৎপাদন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, কৃষকের খরচ ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই অনুপাতে ধানের দাম বাড়ছে না। পরিস্থিতি আরও কঠিন হলে কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থায় বোরো ধানের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে। আর বোরো চাষের বড় অংশই সেচনির্ভর। ফলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির সময়টি কৃষির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজ শুরু হওয়ার কথা। এরপর জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় সেচের প্রয়োজন হয়।

কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১৬ লাখ ডিজেলচালিত ছোট সেচযন্ত্র বা শ্যালো মেশিন রয়েছে। কৃষিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির সংখ্যাও বড়। দেশে প্রায় ১৯ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি রয়েছে, যার প্রায় ৭৫ শতাংশ ডিজেলচালিত বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুমকে কেন্দ্র করে ডিজেলের চাহিদা বেশি থাকে। ফলে নতুন দামে ডিজেল কিনেই কৃষকদের বোরো মৌসুমের বড় অংশের সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হতে পারে। এতে সেচনির্ভর এই ফসলের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, বাংলাদেশের কৃষি এখনো ডিজেলচালিত সেচব্যবস্থার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তাঁর মতে, জ্বালানির দাম বাড়লেও কৃষিতে ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকের বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ের জন্য প্রণোদনা বা ভর্তুকির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, উৎপাদন ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে গেলে অনেক কৃষক নতুন করে বিনিয়োগ করতে সমস্যায় পড়তে পারেন। এর প্রভাব উৎপাদন এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে। তাঁর মতে, কৃষকের উৎপাদন ধরে রাখতে এখন সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচের ব্যয় বেড়ে গেলে কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, চলতি আমন মৌসুমেও কম বৃষ্টির কারণে অনেক কৃষককে সেচের জন্য বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে। বোরো মৌসুমে ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরতা আরও বেশি হওয়ায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সেখানে বড় হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে ভবিষ্যতে চাল আমদানির প্রয়োজনও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেছেন।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, তেলের দাম বাড়লে কৃষির প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। বর্তমানে মাঠে থাকা আমন ধান ঘরে তোলা, মাড়াই ও পরিবহনের ব্যয়ও এতে বাড়তে পারে। তাঁর মতে, কৃষকের বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ের জন্য উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে না পারলে পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদে আগ্রহ কমে যেতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এম এ সাত্তার মণ্ডলও কৃষির উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রয়োজন হলে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থেকে অর্থ সাশ্রয় করে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে তিনি মত দিয়েছেন।

তবে সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, সরকার কৃষকের পাশে রয়েছে। কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে কৃষিতে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে স্বীকার করে তিনি জানান, কী ধরনের প্রভাব তৈরি হয়, তা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কৃষকের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের বিপরীতে তাঁরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবেন কি না। কারণ সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রম, সেচ, যন্ত্রপাতি ও পরিবহনের ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষকের আয় নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে বোরো ধানের মতো সেচনির্ভর ফসলের ক্ষেত্রে ডিজেলের দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

একদিকে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের খাদ্য সরবরাহের বড় অংশ বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। তাই ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু কৃষকের খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উৎপাদন, কৃষকের আয় এবং ভবিষ্যতে চালের বাজার—সব ক্ষেত্রেই এর প্রতিফলন দেখা দিতে পারে। সামনে বোরো মৌসুম শুরু হওয়ার আগে কৃষকের বাড়তি ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত