সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির উদ্যোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৭ বার
সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির উদ্যোগ

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যমান চারটি পেনশন স্কিমের পাশাপাশি এসব স্কিমের ইসলামিক সংস্করণ চালুর মাধ্যমে সুদভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে থাকতে চান এমন মানুষদেরও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নতুন এই পদ্ধতি কীভাবে পরিচালিত হবে, তহবিল কোথায় বিনিয়োগ করা হবে এবং গ্রাহকদের জন্য কী ধরনের মুনাফা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে—এসব বিষয় নিয়ে বর্তমানে কাজ চলছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালুর পর এখন পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার। এসব গ্রাহকের জমা করা প্রায় ৩২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। চারটি স্কিমের মধ্যে ‘সমতা’ স্কিমে সবচেয়ে বেশি, ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন নিবন্ধন করেছেন। অন্যদিকে ‘সুরক্ষা’, ‘প্রবাস’ ও ‘প্রগতি’ স্কিমে নিবন্ধনের সংখ্যা তুলনামূলক কম।

এই পরিস্থিতিতে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে পণ্যের বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এরই অংশ হিসেবে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। নতুন পদ্ধতির আইনগত ভিত্তি তৈরির জন্য আইনের খসড়া প্রণয়ন করে তা জাতীয় সংসদে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য প্রশাসন ও অর্থ শেখ কামরুল হাসান জানিয়েছেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থা আলাদা কোনো পঞ্চম স্কিম হিসেবে চালু করা হবে না। বরং বর্তমানে চালু থাকা চারটি স্কিমের প্রত্যেকটির ইসলামিক সংস্করণ থাকবে। অর্থাৎ ‘প্রবাস’, ‘প্রগতি’, ‘সুরক্ষা’ ও ‘সমতা’—প্রতিটি স্কিমেই অংশগ্রহণকারীরা প্রচলিত পদ্ধতি অথবা শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির মধ্য থেকে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী একটি ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

এর ফলে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারীদের সামনে দুটি ধরনের বিনিয়োগ কাঠামো থাকবে। প্রচলিত ব্যবস্থায় যারা থাকতে চান, তারা বিদ্যমান নিয়ম অনুসরণ করবেন। আর যারা সুদভিত্তিক কাঠামো এড়িয়ে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগব্যবস্থার আওতায় থাকতে চান, তারা নতুন পদ্ধতি বেছে নিতে পারবেন।

তবে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে তহবিলের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হবে। প্রচলিত পেনশন তহবিলের একটি বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয় এবং সেখান থেকে নির্ধারিত হারে আয় আসে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থায় সুদভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় বিকল্প বিনিয়োগ খাত নির্ধারণ করতে হবে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং স্থানীয় পরামর্শকেরা শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থার কাঠামো, পরিচালন পদ্ধতি, বিনিয়োগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য কারিগরি বিষয় নির্ধারণে কাজ করছেন। পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থার আর্থিক স্থায়িত্ব, দীর্ঘমেয়াদি দায় এবং গ্রাহকদের সুবিধার বিষয়গুলোও বিশ্লেষণ করা হবে।

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি পরিচালনার জন্য আলাদা শরিয়া বোর্ড গঠন করা হবে কি না, সেটিও এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সুকুক বন্ডসহ কোন কোন খাতে পেনশন তহবিল বিনিয়োগ করা যাবে, সেই বিষয়েও কাজ চলছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়া বোর্ড এবং সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট শরিয়া কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া হবে।

অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন পদ্ধতি চালুর ক্ষেত্রে শুধু শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের নাম ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়। গ্রাহকদের কাছে বিনিয়োগের ধরন, ঝুঁকি, সম্ভাব্য মুনাফা এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য তুলে ধরতে হবে। অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে এবং সেখান থেকে কীভাবে আয় তৈরি হচ্ছে, তা স্বচ্ছভাবে জানানো হলে গ্রাহকদের আস্থা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মো. আহসান হাবীব মনে করেন, সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে বিভিন্ন ধরনের মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় পণ্যের বৈচিত্র্য আনা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, দেশের একটি শ্রেণির মানুষ সুদভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থায় অংশ নিতে অনাগ্রহী হতে পারেন। তাদের জন্য শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প থাকলে কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শরিয়াহভিত্তিক তহবিলের বিনিয়োগের সম্ভাব্য খাত হিসেবে সুকুক বন্ড, শরিয়াহসম্মত ইক্যুইটি এবং হালাল ব্যবসায় মুদারাবা বা মুশারাকার মতো অংশীদারিত্বভিত্তিক বিনিয়োগ কাঠামো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এসব ব্যবস্থায় প্রচলিত সুদভিত্তিক বিনিয়োগের পরিবর্তে সম্পদ, ব্যবসা বা অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে আয় তৈরির কাঠামো থাকতে পারে।

তবে বাংলাদেশে সুকুক বাজার এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করা একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিনিয়োগের উপকরণ সীমিত থাকলে শরিয়াহভিত্তিক তহবিলের সম্ভাব্য মুনাফা প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় কম হতে পারে—এমন আশঙ্কাও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের আগ্রহ ধরে রাখা এবং তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পদ্ধতির ক্ষেত্রে শক্তিশালী শরিয়া তদারকি, নিয়মিত শরিয়াহ অডিট এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত স্বচ্ছ প্রতিবেদন থাকা প্রয়োজন। এতে গ্রাহকের অর্থ নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী বিনিয়োগ হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে তহবিল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে আরও কিছু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পেনশনার মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী যে বয়স পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পাবেন, তা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পেনশনার নিজে জীবদ্দশায় আজীবন পেনশন পাওয়ার বিধানও থাকছে।

এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির যেসব কর্মী প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধার আওতায় নেই, তাঁদের ‘প্রগতি’ স্কিমে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

প্রবাসী কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়াতেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের ‘প্রবাস’ স্কিম সম্পর্কে অবহিত করার পাশাপাশি বিমানবন্দরে নিবন্ধনের সুযোগ তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে যে প্রণোদনা আগে ১৫ টাকা ছিল, তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করা, পেনশন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ এবং স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার মতো বিষয়ও পর্যালোচনা করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির মূল লক্ষ্য দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনা। সেই লক্ষ্য পূরণে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি যুক্ত হলে নতুন একটি জনগোষ্ঠী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে এর বাস্তব কার্যকারিতা নির্ভর করবে বিনিয়োগের সুযোগ, মুনাফার কাঠামো, শরিয়াহ তদারকি, স্বচ্ছতা এবং তহবিলের আর্থিক স্থায়িত্বের ওপর।

নতুন ব্যবস্থার আইনগত কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর এর বাস্তবায়ন নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর আগে বিনিয়োগের ক্ষেত্র, পরিচালন কাঠামো এবং শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের মানদণ্ড স্পষ্ট করা প্রয়োজন হবে। কারণ পেনশন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অঙ্গীকারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় অংশগ্রহণকারীদের আস্থা ও তহবিলের নিরাপত্তা—দুই বিষয়ই সমান গুরুত্ব বহন করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত