প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলের আলোচনার মধ্যে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা বা আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে তার বিরোধিতা করার কথা জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, জনপ্রতিনিধিদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা অন্যায্য হবে। জামায়াতে ইসলামী এ ধরনের উদ্যোগ সমর্থন করবে না বলেও জানান তিনি।
বুধবার রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। সভায় তিনি সরকারি সুবিধা, কর্মসংস্থান, জ্বালানি তেলের মূল্য, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা, রাজপথের কর্মসূচি এবং গণমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনের ধরনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও কোনো কোনো মহলে চিন্তাভাবনা চলছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে জামায়াতে ইসলামী তার বিরোধিতা করবে। তিনি বলেন, বিরোধী দল সংসদে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে কাজ করছে না।
জামায়াত আমির দাবি করেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগে তাঁদের দলের পক্ষ থেকে সরকারি প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জামায়াতের সংসদ সদস্যরা এসব সুবিধা নেননি। তিনি আরও বলেন, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাও পরবর্তী সময়ে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সংসদে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে কোনো সংসদ সদস্য এসব সুবিধা নেবেন না।
দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়েও সভায় কথা বলেন শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, সরকার এক বছরের মধ্যে এক থেকে দেড় কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলেছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেক মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর মতে, বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রত্যাশিত মাত্রায় আলোচনা হচ্ছে না।
সভায় ঢাকায় সাম্প্রতিক যানবাহনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। এসব ঘটনার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা নাকচ করেন শফিকুর রহমান। তাঁর বক্তব্য, নিজেদের কর্মসূচি সফল করার প্রস্তুতির সময়ে জামায়াত বা তাদের সহযোগীরা কেন নিজেরাই অস্থিরতা তৈরি করবে—এমন প্রশ্ন তিনি তোলেন।
শফিকুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো পক্ষ যদি তাঁদের কর্মসূচি বানচাল করার উদ্দেশ্যে আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি করে থাকে, তাহলে তার দায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে সহিংসতার অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। তাঁর দাবি, জ্বালানি, সার, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, হত্যা এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন জনস্বার্থের বিষয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একাধিক নোটিশ দেওয়া হলেও সবগুলো নোটিশ আলোচনার সুযোগ পাচ্ছে না।
শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে তাঁদের দেওয়া জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও নোটিশ যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ায় তাঁরা রাজপথের কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার বিরোধী দলের পরামর্শ গ্রহণ না করলে সংসদে অবস্থান নিয়ে তাঁদের খুব বেশি কিছু করার থাকে না। তবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে তাঁরা সংসদ থেকে বের হয়ে যেতে চান না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
লংমার্চ কর্মসূচি নিয়েও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন জামায়াত আমির। তাঁর বক্তব্য, জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজপথে লংমার্চ বা রোডমার্চ নতুন কোনো বিষয় নয়। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এমন কর্মসূচি পালন করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, দেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহার হয়। ফলে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি মানুষের ব্যয়ে পড়ে এবং অতিরিক্ত অর্থ মানুষের পকেট থেকে চলে যায়।
জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে সরকার অন্য কয়েকটি দেশের সঙ্গে তুলনা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, যেসব দেশের উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে, সেসব দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার তুলনা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর মতে, শুধু জ্বালানির দাম তুলনা না করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী, যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের কাছে মূল্যবৃদ্ধি সহনীয় মনে হলেও সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের বাস্তবতায় এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য প্রকাশের ধরন নিয়েও কথা বলেন শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, সাংবাদিকদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি যে বক্তব্য দেন, তার সবটুকু অনেক সময় প্রকাশিত হয় না। তাঁর দাবি, বক্তব্যের অংশবিশেষ আলাদা করে উপস্থাপন করলে পাঠক বা দর্শকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, বক্তব্য পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথভাবে উপস্থাপনের নিশ্চয়তা পেলে ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিতে তাঁর আপত্তি থাকবে না। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য উপস্থাপনে প্রেক্ষাপট ও পূর্ণাঙ্গতা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
নির্বাচনের পর সরকারি খরচে বিদেশ সফরে না যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, সরকারি অর্থ ব্যবহার করে বিদেশ সফর করতে চান না। একইভাবে মাসিক যে ভাতা তিনি পান, সেটিও ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে অন্য খাতে দিয়ে দেওয়ার কথা জানান।
নিজের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি বাসা সম্পর্কেও বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। তিনি জানান, সেখানে তিনি বসবাস করেন না। তবে কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য ওই বাসা ব্যবহার করা হয় বলে জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাগত বক্তব্য দেন। দলের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মা’ছুম, হামিদুর রহমান আযাদ, আবদুল হালিম, রফিকুল ইসলাম খানসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভায় শফিকুর রহমানের বক্তব্যে একদিকে সরকারি সুবিধা ও জনপ্রতিনিধিদের আর্থিক সুবিধা নিয়ে দলের অবস্থান উঠে এসেছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, জ্বালানি মূল্য, সংসদীয় কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। তবে এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক দলের অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিভিন্ন অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করেই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।