গাজা পুনর্গঠনে ২৪৫ কোটি ডলারের পরিকল্পনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
গাজা পুনর্গঠনে ২৪৫ কোটি ডলারের পরিকল্পনা

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় পুনর্গঠন ও প্রাথমিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু করতে প্রায় ২৪৫ কোটি ডলারের ছয় মাসের একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে বুধবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ৬৬টি প্রকল্পের এই পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। তবে অর্থায়নের পাশাপাশি গাজায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

শান্তি পর্ষদের প্রকাশিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক ছয় মাসের কর্মসূচির লক্ষ্য হচ্ছে গাজার জরুরি অবকাঠামো পুনরুদ্ধার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা সচল করা, আবাসন সহায়তা দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পরিবেশ তৈরি করা। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের ভিত্তি তৈরি করার কথাও বলা হয়েছে।

তবে ২৪৫ কোটি ডলারের এই অর্থ গাজার পূর্ণ পুনর্গঠনের জন্য নয়। শান্তি পর্ষদের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গাজার ভৌত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেই মধ্যমেয়াদে প্রায় ৩ হাজার ৫২০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। পরবর্তী এক দশকে পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৭ হাজার ১৪০ কোটি ডলার প্রয়োজন হওয়ার হিসাবও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক ছয় মাসের পরিকল্পনাটি মূলত বৃহত্তর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নিউইয়র্কের বৈঠকে শান্তি পর্ষদের গাজা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেন, পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ হচ্ছে কাগজে থাকা কর্মসূচিকে বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়সীমার চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতি ও যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করবে। হামাসসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজায় একটি বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার বিষয়টি পরিকল্পনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে তিনি জানান।

পরিকল্পনার বাস্তবায়নে অবকাঠামো খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ সরানো, অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা, হাসপাতাল মেরামত, সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার, পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সীমান্তসংক্রান্ত অবকাঠামো সচল করার মতো কাজ এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের বিষয়ও রাখা হয়েছে।

গাজার মানুষের জন্য আবাসনের সংকটও পরিকল্পনার একটি বড় অংশ। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন। প্রাথমিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে অস্থায়ী আবাসন ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শীত মৌসুম সামনে রেখে দ্রুত আশ্রয় ও মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

গাজার প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিকল্পনায় একটি কাঠামো রাখা হয়েছে। ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের নিয়ে গঠিত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা বা এনসিএজি দৈনন্দিন বেসামরিক প্রশাসন ও জনসেবার দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে। কমিটির প্রধান আলী শাথ জানিয়েছেন, পুনর্গঠন পুরো গাজা উপত্যকাজুড়ে করার লক্ষ্য রয়েছে এবং কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মানুষকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। তিনি গাজাবাসীকে উপত্যকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিরোধিতার কথাও জানিয়েছেন।

তবে পুনর্গঠনের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিস্থিতিই অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে। শান্তি পর্ষদের পরিকল্পনায় গাজাকে ধীরে ধীরে নিরস্ত্রীকরণ এবং একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির বিষয় রয়েছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন এবং নতুন গাজা পুলিশ বাহিনী গঠনের উদ্যোগও যুক্ত করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য ইসরায়েল ও হামাসসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।

এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চললেও উপত্যকায় সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বুধবারও বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি হামলার খবর পাওয়া গেছে। খান ইউনিস, দেইর আল-বালাহ ও গাজা নগরীতে পৃথক হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় চিকিৎসাকর্মী ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে একদিকে পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থ ও প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, অন্যদিকে মাটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অস্থির রয়েছে।

শান্তি পর্ষদের কর্মকর্তারা মনে করছেন, পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করতে হলে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাধাগুলো অতিক্রম করতে হবে। বিশেষ করে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামাসের অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের ওপর সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি নির্ভরশীল বলে অবস্থান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে পরিকল্পনাটির কাঠামোতে ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণ ও সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে পুনর্গঠন এগিয়ে নেওয়ার ধারণা রয়েছে। ফলে বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।

অর্থায়নও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। শান্তি পর্ষদের কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশকে প্রাথমিক প্রকল্পগুলোর জন্য অর্থ সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে দাতা দেশগুলোর কাছ থেকে গাজার পুনর্গঠনের জন্য বড় অঙ্কের অর্থের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও প্রতিশ্রুত অর্থের একটি অংশ এখনো হস্তান্তর হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নতুন করে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন হবে

পরিকল্পনাটির সঙ্গে গাজার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। যুদ্ধের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা এবং স্থানীয় বাজারব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই শুধু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ নয়, মানুষের আয় ও জীবিকার সুযোগ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ডিজিটাল যোগাযোগ, অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা এবং নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালুর মতো বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় রয়েছে।

গাজার পুনর্গঠন নিয়ে এই পরিকল্পনা প্রকাশের সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে মূলত দুটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, পানি, বিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে বিপুল অর্থ ও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। অন্যদিকে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সেই পুনর্গঠন কার্যকরভাবে শুরু করাও কঠিন।

ফলে ২৪৫ কোটি ডলারের ছয় মাসের পরিকল্পনাটি গাজার জন্য একটি প্রাথমিক পুনরুদ্ধার কাঠামো হিসেবে সামনে এলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে অর্থায়ন, নিরাপদ প্রবেশাধিকার, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমঝোতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর। শান্তি পর্ষদ এখন পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের দিকে যাওয়ার কথা বলছে। তবে গাজার মাটিতে চলমান অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সেই পথ এখনো নানা বাধায় ঘেরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত