মৌলভীবাজারে গ্রাফটিং টমেটো চারায় কোটি টাকার বাণিজ্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
মৌলভীবাজারে গ্রাফটিং টমেটো চারায় কোটি টাকার বাণিজ্য

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মৌলভীবাজারের কৃষিপ্রধান জনপদে টমেটো চাষ এখন আর শুধু শীতকালীন সবজি উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন, মালচিং পেপার ব্যবহার এবং আগাম জাতের টমেটো চাষের মাধ্যমে জেলার অনেক কৃষক ও তরুণ উদ্যোক্তা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছেন। বিশেষ করে কমলগঞ্জ উপজেলায় টমেটোর চাষ ও গ্রাফটিং চারা উৎপাদন ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও যাচ্ছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদিত ৬৫ লাখের বেশি গ্রাফটিং টমেটো চারা ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় এ খাতে কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলার মধ্যে কমলগঞ্জেই টমেটো চাষের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠে এখন টমেটোর চাষ দেখা যাচ্ছে। আদমপুর, মাধবপুর, ইসলামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় একদিকে যেমন আগাম টমেটোর ক্ষেত গড়ে উঠেছে, অন্যদিকে বাড়ির আঙিনা ও আলাদা শেডে চলছে গ্রাফটিং চারা তৈরির কাজ। অনেক কৃষক নিজেদের জমির প্রয়োজনীয় চারা উৎপাদনের পর অতিরিক্ত চারা বাজারে বিক্রি করছেন। এতে কৃষিকাজের পাশাপাশি চারা উৎপাদনও তাদের আয়ের একটি পৃথক উৎসে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত টমেটোর গাছ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয় এবং সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। এ কারণে আগাম টমেটো চাষে এই পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে খরিফ-১ মৌসুমে আগাম জাতের টমেটো চাষ করে কৃষকেরা ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পান। তবে এ বছর সেই প্রত্যাশায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে টমেটোর দাম কম থাকায় অনেক কৃষক লাভের পরিবর্তে লোকসানের আশঙ্কা করছেন।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মৌলভীবাজারে প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে রবি মৌসুমের টমেটো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের খরিফ-১ টমেটো চাষ হয়েছে ১৩০ হেক্টর জমিতে। পাশাপাশি প্রায় ১৯ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ হয়েছে। এর বাইরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমভেদে টমেটো চাষের পরিধি বাড়ছে। একই সঙ্গে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এখন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৬৫ লাখের বেশি টমেটোর চারা উৎপাদিত হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিটি চারা ১২ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে। উৎপাদিত চারার একটি অংশ স্থানীয় কৃষকেরা নিজেদের জমিতে ব্যবহার করছেন এবং বাকি অংশ যাচ্ছে জেলার বাইরে। ফলে টমেটো উৎপাদনের পাশাপাশি চারা উৎপাদন ও বিপণনকে কেন্দ্র করেও একটি আলাদা বাজার তৈরি হয়েছে।

কমলগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে ঢুকলেই এই পরিবর্তনের চিত্র চোখে পড়ে। কোথাও বিস্তীর্ণ জমিতে টমেটোর চারা রোপণের প্রস্তুতি চলছে, কোথাও গাছে ফুল ও ফল আসতে শুরু করেছে। আবার কোনো কোনো বাড়িতে বাঁশ, পলিথিন ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে গ্রাফটিং চারা উৎপাদনের শেড। পরিবারের সদস্যরা মিলেই অনেক ক্ষেত্রে চারা তৈরির কাজ করছেন। কৃষিকাজের এই নতুন ধারায় স্থানীয় নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণও দেখা যাচ্ছে।

তরুণ উদ্যোক্তা কৃষক আব্দুল মান্নানের ক্ষেতেও এই চিত্র স্পষ্ট। শুকুরউল্লাগাঁওয়ের এই কৃষক চলতি বছরে প্রায় ১৩ বিঘা জমিতে আগাম টমেটো আবাদ করেছেন। তাঁর হিসাবে, জমি প্রস্তুত, চারা, সার, কীটনাশক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এত বড় বিনিয়োগের পরও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁর অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এ বছর টমেটো তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষি উপকরণ ও শ্রমের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ কমানোর সুযোগও নেই।

শুধু আব্দুল মান্নান নন, কমলগঞ্জের আরও অনেক কৃষকের একই ধরনের অভিজ্ঞতা। কৃষক আলাউদ্দিন, বদরুজ্জামান বাবু, স্বপন কুমার সিংহ, কিষানি সখিনা বিবিসহ স্থানীয় কৃষকেরা জানিয়েছেন, সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, বাজারে পাওয়া অনেক কীটনাশক ব্যবহার করেও প্রত্যাশিতভাবে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে বাড়ছে খরচ, অন্যদিকে ফসল রক্ষায় অনিশ্চয়তাও থেকে যাচ্ছে।

কৃষকদের আরেকটি অভিযোগ হলো, টমেটো চাষ ও গ্রাফটিং চারা উৎপাদনের মতো সম্ভাবনাময় খাতে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের পরামর্শ পর্যাপ্ত নয়। তাদের দাবি, অনেক সময় কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে এসে টমেটো ক্ষেত বা গ্রাফটিং চারা উৎপাদনের শেড পরিদর্শন করেন না। ফলে রোগবালাই, সার ব্যবস্থাপনা, কীটনাশকের ব্যবহার, সেচ এবং আধুনিক চাষপদ্ধতি নিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেতে তাদের সমস্যায় পড়তে হয়। সরকারি প্রণোদনা না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কৃষক।

তবে কৃষকদের এসব অভিযোগের পাশাপাশি সরকারি পর্যায় থেকেও সহযোগিতার উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, টমেটো চাষিদের প্রণোদনার আওতায় আনার বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। নদীর বাঁধ মেরামতের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ৩৮০ জন কৃষকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং তালিকা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কমলগঞ্জে টমেটো চাষের সম্ভাবনা যথেষ্ট। আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আগাম চাষ বাড়ানো গেলে কৃষকের উৎপাদন ও আয় উভয়ই বাড়তে পারে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রাকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, কমলগঞ্জে ৬০ হেক্টর জমিতে আগাম টমেটো চাষ হয়েছে। গ্রাফটিং পদ্ধতি ও উন্নত চাষপ্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

তবে উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টমেটো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় বলে কৃষককে অনেক সময় ক্ষেত থেকে তোলার পর দ্রুত বাজারে বিক্রি করতে হয়। এ কারণে বাজারে সরবরাহ বেশি হলে দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কৃষকের হাতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদিত টমেটো দীর্ঘ সময় ধরে রেখে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগও সীমিত।

মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. জালাল উদ্দিন জানিয়েছেন, টমেটো সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সুখবর নেই। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যাতে ভবিষ্যতে এলাকায় হিমাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যায়। সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে মৌসুমে বাজারে একসঙ্গে অতিরিক্ত টমেটো চলে আসার কারণে যে দাম পড়ে যায়, সেই চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তার ঘাটতির বিষয়টিও উঠে এসেছে জেলা কৃষি বিভাগের বক্তব্যে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় প্রত্যেক কৃষকের কাছে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। তবে কৃষকদের পাশে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে এবং কোথাও কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

টমেটো চাষকে ঘিরে মৌলভীবাজারে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় অংশ এখন গ্রাফটিং চারাকে কেন্দ্র করে। একটি চারা ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হলে ৬৫ লাখের বেশি চারার বাজারমূল্য হিসাব করলেই এই খাতের আর্থিক পরিধি বোঝা যায়। শুধু চারা বিক্রি নয়, চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শ্রম, শেড নির্মাণ, পরিবহন, উপকরণ সরবরাহ এবং পরবর্তী টমেটো উৎপাদন—সব মিলিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত।

কৃষকেরা মনে করছেন, সঠিক সময়ে পরামর্শ, মানসম্মত কৃষি উপকরণ, সহজ শর্তে ঋণ, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা গেলে টমেটো চাষ আরও লাভজনক হতে পারে। বিশেষ করে আগাম জাতের টমেটো উৎপাদনে বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা গেলে কৃষকের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ সুবিধা গড়ে উঠলে উৎপাদিত ফসলের মূল্য সংযোজনের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

মৌলভীবাজারের মাঠে এখন যে টমেটোর সবুজ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে কৃষকের বিনিয়োগ, শ্রম ও ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। একদিকে ৬৫ লাখের বেশি গ্রাফটিং চারা উৎপাদন ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের মাধ্যমে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বাজারদর ও উৎপাদন ব্যয় নিয়ে কৃষকদের উদ্বেগও স্পষ্ট। তাই এই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, কৃষকের ন্যায্য দাম, সংরক্ষণ সুবিধা, সময়মতো কৃষি পরামর্শ এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কমলগঞ্জের মাঠে মাঠে টমেটো চাষের বিস্তার এবং বাড়িতে বাড়িতে গ্রাফটিং চারা উৎপাদন প্রমাণ করছে, কৃষকেরা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী। এখন প্রয়োজন সেই আগ্রহ ও উদ্যোগকে কার্যকর সহায়তার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা। তাহলে মৌলভীবাজারের টমেটো শুধু স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করবে না, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য একটি স্থায়ী আয়ের ক্ষেত্র হিসেবেও আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত