সার বিতরণে অস্থিরতা, ডিলার নীতিমালায় বাড়ছে প্রশ্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
সার বিতরণে অস্থিরতা, ডিলার নীতিমালায় বাড়ছে প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার সরকারি দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ে সারের প্রাপ্যতা নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তি ও ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় সার পাওয়ার জন্য কৃষকদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ার অভিযোগ, ডিলারদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা এবং কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধের মতো ঘটনাও ঘটছে। এতে শুধু কৃষকের দৈনন্দিন দুর্ভোগই বাড়ছে না, বরং সার ব্যবস্থাপনা ও ডিলার নিয়োগের নীতিমালা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে বড় ধরনের সারসংকট নেই। আগামী বোরো মৌসুম শুরুর আগ পর্যন্ত পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত করার জন্য আগাম আমদানি পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ে কৃষকদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন এলাকার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সরকারি দাবির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে সার সংকটের প্রকৃত কারণ মজুতের ঘাটতি, বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা, পরিবহন ও বিতরণে সমস্যা, নাকি ডিলার পর্যায়ের অনিয়ম—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় সারের জন্য কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর খবর পাওয়া গেছে। ২০ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা এলাকায় কৃষকেরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও সার না পাওয়ার অভিযোগে মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে কৃষি কর্মকর্তা ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সার বিতরণ শুরু করা হয়। একই জেলার অন্য এলাকাতেও সার না পাওয়াকে কেন্দ্র করে ডিলারকে ধাওয়া এবং কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনার মাত্রা কতটা বেড়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের রাজীবপুরে ভোর থেকেই বিপুলসংখ্যক কৃষক সার নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন ডিলারের কাছে ৫৬০ বস্তা সার থাকলেও চাহিদা ছিল কয়েক হাজার বস্তার কাছাকাছি। ফলে উপস্থিত কৃষকদের একটি বড় অংশ সার না পেয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকেরা বলছেন, কাগজে-কলমে সার মজুত থাকার তথ্য থাকলেও প্রয়োজনের সময় তা হাতের নাগালে না পাওয়া গেলে সেই মজুত তাদের জন্য বাস্তব সমাধান তৈরি করছে না।

সারের এই বিতরণব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন বা বিএফএও আপত্তি জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, মাঠপর্যায়ে কৃষকের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকলে গুদামে সার থাকার পরও স্থানীয় পর্যায়ে সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে পুরোনো কাঠামোর সঙ্গে নতুন ডিলার ব্যবস্থাপনার সমন্বয় না থাকলেও বিতরণে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করছে।

এদিকে সার ডিলার নিয়োগের কাঠামো গত কয়েক বছরে একাধিকবার পরিবর্তন হওয়ায় বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। ২০০৯ সালের নীতিমালায় একটি ইউনিয়নে একজন মূল ডিলারের অধীনে নয়জন খুচরা বিক্রেতার ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তী সময়ে কাঠামো পরিবর্তন করে ইউনিয়ন পর্যায়ে একাধিক ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। ২০২৬ সালের নতুন সমন্বিত নীতিমালায় প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় তিনজন করে ডিলার রাখার বিধান করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নীতিমালায় ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো সহজ করা এবং বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম কমানো। ডিলারদের দায়িত্ব, বিক্রয়কেন্দ্র এবং সার বিতরণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়মও করা হয়েছে। নীতিমালা লঙ্ঘন করলে ডিলারশিপ বাতিলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে নতুন ডিলার নিয়োগ নিয়েই আপত্তি তুলেছে বিএফএ। ২১ সেপ্টেম্বর সংগঠনটি নতুন নিয়োগ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার আহ্বান জানায়। তাদের মতে, নীতিমালার কয়েকটি ধারা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে, বিশেষ করে ডিলার ইউনিট, দায়িত্ব ও বিদ্যমান ডিলারদের অবস্থান সম্পর্কে আরও পরিষ্কার নির্দেশনা প্রয়োজন। পাশাপাশি বস্তাপ্রতি বিক্রয় কমিশন ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

ডিলার নিয়োগ ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও বিভিন্ন এলাকায় উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ সর্বত্র একইভাবে প্রতিষ্ঠিত—এমন কোনো তথ্য নেই। কোথাও স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রাজনৈতিক চাপের কথা বলেছেন, আবার কোথাও কর্মকর্তারা এমন চাপ অনুভব করেননি বলে জানিয়েছেন। ফলে ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগকে সার্বিক বাস্তবতা হিসেবে না দেখে পৃথক এলাকার অভিযোগ, আবেদনপ্রক্রিয়া এবং যাচাইয়ের ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

চুয়াডাঙ্গায় ৪৫টি ডিলারশিপের বিপরীতে ৬৪৩টি আবেদন জমা পড়ার তথ্যও আলোচনায় এসেছে। প্রতি ডিলারশিপের বিপরীতে এত বেশি আবেদন পড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে এই নিয়োগকে ঘিরে আগ্রহের মাত্রা বোঝা যায়। আবেদনকারীদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী—এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে আবেদনকারী রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হলেই তিনি অনুপযুক্ত বা অনিয়মের অংশ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, ব্যবসায়িক সক্ষমতা, অবকাঠামো এবং নির্ধারিত সরকারি মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে প্রশাসনের অভিযানও চলছে। আগস্ট মাসে সারাদেশে ২০৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ স্থগিত করার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, সরকার মাঠপর্যায়ে বিতরণব্যবস্থার কিছু অনিয়মের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় গত কয়েক বছরের তুলনায় বরাদ্দ কম নয়; বরং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সরকারি গুদামে দীর্ঘ সময় সার সংরক্ষণের সুযোগ সীমিত হওয়ায় সরবরাহ ও বিতরণের সময়সূচি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কর্মকর্তাদের কেউ কেউ স্থানীয় পর্যায়ে হঠাৎ তৈরি হওয়া উত্তেজনার পেছনে কোনো বিশেষ কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

কৃষি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সার ব্যবস্থাপনায় শুধু জাতীয় পর্যায়ে মোট মজুতের হিসাব দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোন জেলায় কত জমি আবাদ হচ্ছে, কোন সময়ে কী পরিমাণ সার প্রয়োজন, ডিলারের কাছে কত সার পৌঁছেছে, কতটুকু বিক্রি হয়েছে এবং কৃষকের হাতে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু গেছে—এসব তথ্য নিয়মিতভাবে সমন্বয় করা দরকার। বিশেষ করে চাহিদার সময় ও সরবরাহের সময়ের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে কাগজে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও মাঠে সংকটের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

ডিলার ব্যবস্থাপনাতেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রয়োজন রয়েছে। বারবার নীতিমালা পরিবর্তন হলে পুরোনো ডিলার, নতুন আবেদনকারী, কৃষি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে দায়িত্ব ও প্রত্যাশা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। নতুন ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে একদিকে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে যোগ্য ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা যেতে পারে।

কৃষিবিদ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিরা সংকট মোকাবিলায় অঞ্চলভিত্তিক বাফার স্টক বা অতিরিক্ত মজুত ব্যবস্থার কথাও বলছেন। তাঁদের মতে, কোনো একটি অঞ্চলে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেলে যাতে স্থানীয় পর্যায়ে কয়েক সপ্তাহের জন্য সরবরাহ বজায় রাখা যায়, সে ধরনের সক্ষমতা থাকা দরকার। বিশেষ করে বোরো মৌসুমের মতো উচ্চ চাহিদার সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য ব্যাঘাতও কৃষকের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

কৃষি সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন। সরকার অসাধু ব্যবসায়ী বা অনিয়মে জড়িত ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলছে। আগামী বোরো মৌসুমের আগে পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত করার জন্য আমদানি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও সরকারি পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে।

তবে কৃষকের কাছে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো—তিনি প্রয়োজনের সময়ে ন্যায্য দামে, নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন কি না। গুদামে মজুত, কাগজে বরাদ্দ কিংবা নীতিমালার বিধান—সবকিছুর চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করে মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগের ওপর। একজন কৃষক যদি ভোরে এসে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পান, কিংবা সার পাওয়ার জন্য সড়কে নামতে বাধ্য হন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা কৃষি ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা সার সরবরাহের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে সার নিয়ে অনিশ্চয়তা শুধু কৃষকের বর্তমান খরচ বাড়ায় না, ভবিষ্যৎ উৎপাদন, বাজারদর এবং খাদ্য সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এখন প্রয়োজন মজুতের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে যে ফারাক দেখা যাচ্ছে, তার কারণ নিরপেক্ষভাবে চিহ্নিত করা। একই সঙ্গে ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা, বরাদ্দের যৌক্তিকতা, বিতরণে নজরদারি এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। নীতিমালা পরিবর্তনের পাশাপাশি যদি মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা যায়, তাহলে কৃষকের ভোগান্তি কমানোর পথ তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত