বগুড়ায় কৃষক-ভোক্তার মাঝে দামের বড় ফারাক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
বগুড়ায় কৃষক-ভোক্তার মাঝে দামের বড় ফারাক

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বগুড়ার মাঠে কৃষক যে পটোল কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দরে বিক্রি করছেন, শহরের বাজারে পৌঁছানোর পর সেই পটোলের দাম বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। মাঝখানে দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু দামের ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণ। মহাস্থান হাটে কৃষকের কাছ থেকে কেনা একই পটোল কেজিতে ৪০ টাকা পর্যন্ত দরে হাতবদল হলেও মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।

শুধু পটোল নয়, শসার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই ধরনের চিত্র। কৃষক ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে শসা বিক্রি করলেও মহাস্থান হাটে তার দাম উঠছে প্রায় ৪০ টাকা। এরপর শহরের বাজারে গিয়ে সেই শসার দাম দাঁড়াচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর পথেই সবজির দামে তৈরি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।

সোমবার মহাস্থান হাট ও বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজার ঘুরে কৃষক, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে দামের এই ব্যবধানের বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীরা পরিবহন, শ্রমিক, হাটের খাজনা, পণ্যের বাছাই, পচন ও অন্যান্য খরচের কথা বলছেন। অন্যদিকে কৃষক ও ভোক্তাদের প্রশ্ন, এসব খরচের বাইরে বাজারের বিভিন্ন স্তরে পণ্যের দাম কতটা বাড়ছে এবং সেই বাড়তি অর্থের কত অংশ প্রকৃত উৎপাদক পাচ্ছেন?

সবজি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষকের জন্য বাজারদর শুধু একটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পুরো মৌসুমের পরিশ্রম, উৎপাদন খরচ এবং পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাব। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে কৃষককে অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফসল তোলার পর বাজারে নিয়ে বিক্রি করেই সেই খরচের বড় অংশ উঠিয়ে আনতে হয়। ফলে মাঠপর্যায়ে দাম কম থাকলে উৎপাদক পর্যায়েই লাভের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে।

মহাস্থান হাটে কৃষকের কাছ থেকে সোমবার পটোল কেনা হয়েছে কেজিপ্রতি প্রায় ৩০ টাকা দরে। হাটে হাতবদলের পর সেই পটোলের দাম উঠেছে প্রায় ৪০ টাকা। আর বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে মানভেদে একই পটোল বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি। ফলে কৃষকের বিক্রয়মূল্য ও শহরের খুচরা দামের মধ্যে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৩০ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

শসার ক্ষেত্রেও কৃষকের পাওয়া দাম এবং শহরের খুচরা দামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। মাঠে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়া শসা মহাস্থানে প্রায় ৪০ টাকা এবং ফতেহ আলী বাজারে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। বাজারের এই ব্যবধানের কারণে একই পণ্যের জন্য উৎপাদক ও ভোক্তা উভয় পক্ষই ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচের তুলনায় তারা সবসময় কাঙ্ক্ষিত দাম পান না। তার ওপর হাটে পণ্য বিক্রির সময় খাজনা দিতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ধলতা বা বাড়তি ওজনের বিষয়টিও থাকে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪০ কেজির এক মণের পরিবর্তে কখনও ৪২ থেকে ৪৩ কেজি পর্যন্ত সবজি দিতে হয়। দূরের বাজারে পণ্য পাঠানোর সময় কিছু সবজি নষ্ট হওয়া বা ওজন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এই বাড়তি পণ্য নেওয়া হয় বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করেন।

কৃষক আবুল হোসেনের হিসাব অনুযায়ী, ৪০ কেজি পটোল কেজিতে ৩০ টাকা দরে বিক্রি করলে মোট দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু একই অর্থের বিনিময়ে যদি ৪২ কেজি পটোল দিতে হয়, তাহলে কার্যত কেজিপ্রতি দাম নেমে আসে প্রায় ২৮ টাকা ৫৭ পয়সায়। ৪৩ কেজি পণ্য দিলে কার্যকর দর আরও কমে প্রায় ২৭ টাকা ৯১ পয়সায় দাঁড়ায়। এর সঙ্গে হাটের খাজনা যুক্ত হলে কৃষকের প্রকৃত আয় আরও কমে যায়।

কৃষক শাহিদ আলী বলেন, সবজি উৎপাদনের পেছনে মাঠের শ্রমিক, গাড়িভাড়া, হাটের খাজনা এবং গন্তব্যে শ্রমিকের খরচ রয়েছে। বাজারে কোনো একটি সবজির দাম তুলনামূলক বেশি দেখালেও সব খরচ বাদ দেওয়ার পর কৃষকের হাতে প্রকৃত লাভ অনেক সময় প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকে।

এদিকে পরিবহন খরচ বৃদ্ধির বিষয়টিও বাজারদরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর চালক ও ব্যবসায়ীরা দূরের পথে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন। তবে বিভিন্ন রুটের ভাড়া এবং একেকটি গাড়িতে পরিবহন করা পণ্যের পরিমাণ হিসাব করলে বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই কেজিপ্রতি তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

একজন পিকআপচালকের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জে পিকআপের ভাড়া আগে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা থাকলেও এখন তা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে হয়েছে। এক ট্রিপে প্রায় ১৫ লিটার জ্বালানি লাগে। আবার বগুড়া থেকে টাঙ্গাইল রুটে ভাড়া আগে প্রায় ৮ হাজার টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে। চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার কেজি পণ্য পরিবহন করা হলে বাড়তি ভাড়ার বড় অংশই পণ্যের মোট পরিমাণের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।

চট্টগ্রাম রুটেও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বগুড়া থেকে চট্টগ্রামে যাওয়া-আসার ভাড়া আগে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে। প্রায় ১৪ হাজার কেজি সবজি বহনকারী গাড়িতে এই বাড়তি ভাড়ার প্রভাব কেজিপ্রতি হিসাব করলে তুলনামূলকভাবে কম পড়ে। তবে পরিবহন ছাড়াও শ্রমিক, প্যাকেট বা পলিথিন, বাছাই, নষ্ট পণ্য এবং বাজারের অন্যান্য খরচ রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

মহাস্থান থেকে বগুড়া শহরে সবজি পরিবহনের ক্ষেত্রেও ভাড়া বেড়েছে। স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক ভ্যানের ভাড়া আগে প্রায় ১৫০ টাকা থাকলেও এখন তা ২৫০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। একটি ভ্যানে প্রায় ১৬০ থেকে ২০০ কেজি সবজি বহন করা যায়। ফলে ভাড়া ১০০ টাকা বাড়লেও পণ্যের পরিমাণের ওপর ভাগ করলে কেজিপ্রতি বাড়তি খরচ প্রায় ৫০ থেকে ৬৩ পয়সার মতো দাঁড়ায়।

অন্যদিকে গত কয়েক দিনে হাটে কয়েকটি সবজির দাম কমলেও শহরের বাজারে সেই কমতির প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। মহাস্থান হাটে পটোলের দাম ৪০ টাকা থেকে কমে ২৫ থেকে ৩০ টাকা, করলা ৫৫ টাকা থেকে ৪৫ টাকা, ফুলকপি ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং মুলা ৩৫ টাকা থেকে কমে ২২ টাকা হয়েছে। লেবুর দামও কমেছে। কিন্তু শহরের ফতেহ আলী বাজারে একই সময়ে পটোল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, করলা প্রায় ৮০ টাকা এবং ফুলকপি ১৬০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বাজারব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বগুড়ার সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের সম্পাদক কেজিএম ফারুক মনে করেন, ব্যবসায়ীদের উল্লেখ করা খরচের সঙ্গে বাজারে পণ্যের দামের ব্যবধানের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কৃষকের কাছ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে কেনা পটোল শহরে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হওয়ার ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব একাই এত বড় ব্যবধানের ব্যাখ্যা দেয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শহরের ভোক্তারাও দামের এই ব্যবধান নিয়ে উদ্বিগ্ন। ফতেহ আলী বাজারে কয়েকজন ক্রেতা জানান, কৃষক কম দামে পণ্য বিক্রি করছেন বলে জানা গেলেও শহরে তাদের সেই পণ্য তুলনামূলক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদক কম দাম পাওয়ার পাশাপাশি ভোক্তাকেও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মোস্তফা কামাল বলেন, আয় একই থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ বাড়তে থাকায় সংসারের হিসাব সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আরেক ক্রেতা মনজুরুল হকের মতে, কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে পণ্যের দাম কোথায় কতটা বাড়ছে, তার একটি স্বচ্ছ হিসাব থাকা প্রয়োজন।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বগুড়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং তার প্রভাব বাজারদরেও পড়তে পারে। তবে তেলের দাম বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোনো ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বাড়াতে পারেন না।

সবজির বাজারে কৃষক থেকে ভোক্তার যাত্রাপথে একাধিক হাতবদল এবং বিভিন্ন ধরনের খরচ যুক্ত হয়। এই ব্যবস্থায় উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। কৃষক যেন উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য দাম পান এবং একই সঙ্গে ভোক্তাকেও অযৌক্তিক বাড়তি দামে পণ্য কিনতে না হয়—এ জন্য বাজারের প্রতিটি স্তরে দামের পরিবর্তন ও খরচের হিসাব আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।

বগুড়ার সবজি বাজারের বর্তমান চিত্র তাই শুধু পটোল বা শসার দামের পার্থক্যের ঘটনা নয়; এটি কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার দূরত্বেরও একটি প্রতিচ্ছবি। মাঠে কৃষকের ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদিত সবজি যখন শহরের বাজারে পৌঁছে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয়, তখন সেই বাড়তি অর্থের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। বাজারের প্রতিটি স্তরে প্রকৃত খরচ, ন্যায্য মুনাফা এবং পণ্যের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি স্বচ্ছ থাকলেই কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত