প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণে বড় ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন করে বোয়িংয়ের আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পর এসব উড়োজাহাজের মূল্য পরিশোধ কীভাবে হবে, তা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ক্রয়ের অর্থ সরাসরি সরকারি বাজেট থেকে পরিশোধ করা হবে না। বিমানের নিজস্ব আয় এবং উপযুক্ত অর্থায়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে উড়োজাহাজগুলোর মূল্য পরিশোধ করা হবে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, উড়োজাহাজগুলো একসঙ্গে হাতে আসবে না; নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ধাপে ধাপে ডেলিভারি দেওয়া হবে। ফলে অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও একইভাবে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিমানের আর্থিক সক্ষমতা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুট থেকে সম্ভাব্য আয় এবং ভবিষ্যৎ যাত্রী চাহিদা ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনা করেই এ ক্রয়পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিমান খাতে নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশের আকাশপথে যাত্রী পরিবহন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। বর্তমানে বিমানের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় দেশের বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে বিদেশি এয়ারলাইনসের ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুন বহর যুক্ত হলে যাত্রী পরিবহনে বিমানের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘপথের আন্তর্জাতিক রুটে সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মন্ত্রী জানান, বিমান বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে গত ৩০ এপ্রিল ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার জন্য চুক্তি করা হয়েছিল। ওই চুক্তিতে থাকা অতিরিক্ত উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ বা ‘রাইট টু পারচেজ অ্যাডিশনাল এয়ারক্রাফট’-এর আওতায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আরও ১১টি বোয়িং কেনার সম্পূরক চুক্তি করা হয়েছে। নতুন চুক্তিতে রয়েছে পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স ন্যারোবডি উড়োজাহাজ।
এর ফলে সব মিলিয়ে বিমানের জন্য ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ওয়াইডবডি এবং ১০টি ন্যারোবডি উড়োজাহাজ। ওয়াইডবডি বহরের মধ্যে রয়েছে দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ এবং ১৩টি বোয়িং ৭৮৭-১০। আর ন্যারোবডি বহরে যুক্ত হওয়ার কথা ১০টি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। নতুন বহরের এই বিন্যাসের মাধ্যমে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘপাল্লার বিভিন্ন ধরনের রুটে বিমানের কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
চুক্তির সময়সূচি অনুযায়ী, ২০৩১ সালের নভেম্বর নাগাদ প্রথম উড়োজাহাজটি বিমানের কাছে ডেলিভারি পাওয়ার কথা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে সরবরাহের পর ২০৩৫ সালের মধ্যে সর্বশেষ উড়োজাহাজটি বহরে যুক্ত হওয়ার কথা। তবে অপেক্ষার সময় কমিয়ে ২০২৭-২৮ সালের মধ্যেই অন্তত একটি উড়োজাহাজ সরবরাহের জন্য বোয়িং কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিমানমন্ত্রী। দ্রুত একটি উড়োজাহাজ পাওয়া গেলে নতুন বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনার প্রাথমিক কার্যক্রম আগেই শুরু করা সম্ভব হবে।
উড়োজাহাজ কেনার এই পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থায়ন। বড় অঙ্কের মূলধনি বিনিয়োগের প্রয়োজন হওয়ায় রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার ক্ষেত্রে এ ধরনের ক্রয় সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত থাকে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের সাধারণ বাজেটের ওপর সরাসরি চাপ না দিয়ে বিমানের নিজস্ব আয়কে এ অর্থ পরিশোধের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ নতুন উড়োজাহাজগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগিয়ে আয় বাড়ানো এবং সেই আয় থেকে পর্যায়ক্রমে ক্রয়মূল্য পরিশোধের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
তবে এই পরিকল্পনার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে বিমানের আয় বৃদ্ধি, রুট পরিচালনার দক্ষতা, যাত্রীসংখ্যা, জ্বালানি ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজারের পরিবর্তনের ওপর। নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার পর সেগুলো নিয়মিত ও লাভজনকভাবে পরিচালনা করতে পারলে নিজস্ব আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুটে প্রতিযোগিতা, টিকিটের মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং পরিচালন ব্যয়ের পরিবর্তনও ভবিষ্যৎ আর্থিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বহর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুধু বোয়িংয়ের ওপর নির্ভর না করে এয়ারবাসের উড়োজাহাজও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। প্রস্তাবিত উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি এ৩২১ নিও ন্যারোবডি। ফলে ভবিষ্যতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই নির্মাতার উড়োজাহাজের সমন্বয়ে একটি মিশ্র বহর গড়ে উঠতে পারে।
মন্ত্রীর মতে, এই মিশ্র বহর তৈরির পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। বিভিন্ন ধরনের রুটের জন্য ভিন্ন আকার ও সক্ষমতার উড়োজাহাজ প্রয়োজন হয়। বড় উড়োজাহাজ দীর্ঘপথের উচ্চ চাহিদার রুটে ব্যবহার করা যেতে পারে, অন্যদিকে তুলনামূলক ছোট ন্যারোবডি উড়োজাহাজ কম দূরত্বের বা মাঝারি চাহিদার রুট পরিচালনায় কার্যকর হতে পারে। যাত্রী চাহিদা, বিমানের বিদ্যমান নেটওয়ার্ক, উড়োজাহাজের রেঞ্জ, আসনসংখ্যা, প্রতি ফ্লাইটে সম্ভাব্য যাত্রী এবং সাপ্তাহিক ফ্লাইটের সংখ্যা বিবেচনা করেই ওয়াইডবডি ও ন্যারোবডির সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের আকাশপথের বাজারে বিমানের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও এ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিমানযাত্রীর চাহিদার ২০ শতাংশের কিছু বেশি বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পূরণ করতে পারছে। অর্থাৎ দেশের বড় একটি অংশের যাত্রী বিদেশি এয়ারলাইনসের মাধ্যমে ভ্রমণ করছেন। বহরে পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ না থাকাকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
এ ক্ষেত্রে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণের মডেলকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার বহরে বর্তমানে ১৬৭টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি। দুই দেশের আকাশপথের বাজার, ভৌগোলিক অবস্থান ও ব্যবসায়িক বাস্তবতা এক নয়; তবু একটি রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা কীভাবে পরিকল্পিতভাবে বহর সম্প্রসারণ করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে পারে, সে দৃষ্টিকোণ থেকে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিমানের সামনে রয়েছে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ—নতুন উড়োজাহাজকে কার্যকরভাবে পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করা। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষ জনবল প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি যাত্রীসেবা, সময়ানুবর্তিতা, রুট ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়লেই একটি বিমান সংস্থার আয় বা বাজার অংশীদারত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে না।
বিমানমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন, উড়োজাহাজ কেনার এ পরিকল্পনায় কোনো ভূরাজনৈতিক প্রভাব নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রী চাহিদা ও বিমানের ভবিষ্যৎ নেটওয়ার্কের প্রয়োজন বিবেচনা করেই বহর সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত করার আলোচনা থেকেও বহরকে দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্যপূর্ণ করার পরিকল্পনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বহর পরিকল্পনার একটি বড় পদক্ষেপ। তবে এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে উড়োজাহাজগুলো সময়মতো পাওয়া, সঠিক রুটে ব্যবহার, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, যাত্রীসেবা উন্নয়ন এবং নিজস্ব আয় বৃদ্ধির সক্ষমতার ওপর। সরকারের সাধারণ বাজেটে সরাসরি চাপ না দিয়ে বিমানের নিজস্ব আয় থেকে মূল্য পরিশোধের যে পরিকল্পনার কথা মন্ত্রী জানিয়েছেন, সেটিও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক শৃঙ্খলা ও বাণিজ্যিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
যাত্রীদের কাছে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে নতুন উড়োজাহাজের সংখ্যা নয়, বরং এসব উড়োজাহাজের মাধ্যমে কতটা বেশি রুট, কতটা উন্নত সেবা এবং কতটা প্রতিযোগিতামূলক ভ্রমণসুবিধা তৈরি করা যায়। রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার বহর বড় করার এই উদ্যোগ তাই কেবল উড়োজাহাজ কেনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের বিমান পরিবহন খাতের সক্ষমতা, যাত্রীদের প্রত্যাশা এবং আন্তর্জাতিক আকাশপথে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত