এআই নিরাপত্তায় প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৯ বার
এআই নিরাপত্তায় প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তি

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারকে ঘিরে নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি ও অবকাঠামোগত চাপ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে একটি স্বেচ্ছামূলক এআই নিরাপত্তা চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণে নিজের সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের পর এসব কথা জানান ট্রাম্প।

হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে এআই শিল্পের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা অংশ নেন। আলোচনায় এআই ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকি, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রে এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয় গুরুত্ব পায়। বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই ব্যবস্থার ওপর শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলা এবং স্বাধীন নিরীক্ষকদের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে যে তাদের তৈরি এআই সিস্টেমগুলো নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে। পাশাপাশি কোনো এআই সরঞ্জাম যেন অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় প্রবেশ বা সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনে সহায়তা না করে, সেদিকেও নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চুক্তিটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার পরিবর্তে শিল্পখাতের স্বেচ্ছামূলক অঙ্গীকার হিসেবে সামনে এসেছে।

ট্রাম্প এই সমঝোতাকে এআই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি প্রযুক্তি খাতের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ব্যক্তিরা এতে যুক্ত হয়েছেন এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনিও এতে স্বাক্ষর করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগ এআই ব্যবহারে একটি সুরক্ষা কাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রযুক্তি নির্বাহীদের মধ্যে ছিলেন ওপেনএআইয়ের গ্রেগ ব্রকম্যান, অ্যানথ্রপিকের দারিও আমোদেই, মেটার মার্ক জাকারবার্গ, গুগলের সুন্দর পিচাই এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং। মেটার প্রধান নির্বাহী জাকারবার্গ জানান, এআই সিস্টেমের জন্য শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরিতে প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মত হয়েছে।

এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, ততই এর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম এআই এজেন্ট নিয়ে প্রযুক্তি খাতের ভেতরেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এআই এজেন্ট নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় প্রবেশের চেষ্টা করেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় এআই ব্যবহারে মানুষের তদারকি ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের প্রশাসন এআই খাতে অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে আসছে। এর আগে প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগে এআই উদ্ভাবনকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং সরকারি ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন চুক্তিটিও সেই নীতির ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এআই নিরাপত্তা নিয়ে জনমত পুরোপুরি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণের পক্ষে নয়। সাম্প্রতিক এক দেশব্যাপী জরিপে অংশ নেওয়া ৭৩ শতাংশ মানুষ বলেছেন, এআইয়ের কারণে সমাজে গুরুতর ক্ষতি ঠেকাতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যথেষ্ট কাজ করছে না। একই জরিপে ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা এআইয়ের উন্নয়নের গতি ধীর করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির পাশাপাশি নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে জনসাধারণের উদ্বেগও উল্লেখযোগ্য।

এআই নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈঠকে ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন হয়। সেই সক্ষমতা সরবরাহ করতে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এসব স্থাপনার জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবকাঠামো ব্যয় এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিরোধিতা দেখা দিয়েছে।

ডেটা সেন্টার বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্প তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও সুবিধা তৈরি করবে। তবে ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা নিয়ে এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে আলাদা উদ্যোগও নিয়েছে। ওই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ডেটা সেন্টারের বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের ব্যয় যেন সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর সরাসরি চাপ না পড়ে। ফলে এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যয় ও গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়টিও সমান্তরালে আলোচনায় রয়েছে।

আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুৎ ব্যয়ের প্রশ্নটি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেসব এলাকায় বড় ডেটা সেন্টার নির্মাণ হচ্ছে, সেখানে স্থানীয় জনগণের ওপর অবকাঠামোগত চাপ এবং বিদ্যুৎ ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছে। ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রাখতে কাজ করবে।

প্রযুক্তি নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প এআই নিরাপত্তা তদারকির জন্য ১০ সদস্যের একটি বোর্ড গঠনের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন। তবে সম্ভাব্য সদস্যদের নাম বা বোর্ডের সুনির্দিষ্ট কাঠামো তখনও ঘোষণা করা হয়নি। হোয়াইট হাউসে এআই নীতির নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নতুন একজন কর্মকর্তার নামও শিগগির ঘোষণা করা হতে পারে বলে তিনি জানান।

বৈঠকটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল হোয়াইট হাউসের বাইরে প্রযুক্তি খাতের নির্বাহীদের নিয়ে প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য উপস্থিতি। রুদ্ধদ্বার মধ্যাহ্নভোজের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে আসেন এবং প্রায় ৩০ মিনিট বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তার পাশে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের উপস্থিতি এআই নীতি ও প্রযুক্তি শিল্পের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়টি প্রকাশ্যে তুলে ধরে।

এদিকে একই দিনে ট্রাম্প প্রশাসন সরকারি সেবা ব্যবহারের জন্য একটি নতুন এআইভিত্তিক সরঞ্জাম চালুর ঘোষণা দিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি সেবা ও তথ্য পাওয়া সহজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন নির্বাহী এই উদ্যোগের উদ্বোধনী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন।

ট্রাম্প অনুষ্ঠানে নতুন এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও এর নিরাপত্তা দাবির বিস্তারিত প্রমাণ তিনি প্রকাশ্যে দেননি। ফলে নতুন প্রযুক্তি সরকারি কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা এবং জবাবদিহির বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।

এআই খাতের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের আরেকটি দিক রাজনৈতিক অর্থায়ন। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটিকে প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন নির্বাহী ও বিনিয়োগকারীর বড় অঙ্কের অনুদানের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। এর মধ্যে ওপেনএআইয়ের গ্রেগ ব্রকম্যান ও তার স্ত্রী আনা ব্রকম্যানের সম্মিলিত ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার অনুদানের তথ্যও রয়েছে।

ফলে এআই নিরাপত্তা, প্রযুক্তি খাতের স্বনিয়ন্ত্রণ, সরকারি নীতি এবং বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক—সবকটি বিষয়ই একই আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব ধরে রাখতে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা কাঠামো জোরদারের চাপও বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন চুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বেচ্ছামূলক প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন করে এবং ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত স্বার্থ কীভাবে সমন্বয় করা হয়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে। এআইয়ের অগ্রগতির সঙ্গে নিরাপত্তা ও জবাবদিহির ভারসাম্য কতটা রাখা যায়, সেটিই আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত