প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় সফরকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন এক কূটনৈতিক কৌতূহল ও জটিলতা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর চার দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান যাচ্ছেন। যেকোনো দেশের শীর্ষ নেতার দ্বিপক্ষীয় সফরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের প্রধান কারিগর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তবে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এক পদক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর বহুপ্রত্যাশিত টোকিও সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলীকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অংশ না নেওয়ারও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, শীর্ষ এই সফরে টোকিওতে রাষ্ট্রদূত দাউদ আলীর কোনো ভূমিকা থাকবে না। তাঁর জায়গায় সফরের যাবতীয় দ্বিপক্ষীয় প্রস্তুতি, সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনা তদারকের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামকে। সচিব মো. নজরুল ইসলাম গত বুধবার ঢাকা থেকে টোকিওর উদ্দেশে যাত্রা করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করবেন।
অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকদের মতে, কোনো শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরের ঠিক আগে স্বাগতিক দেশে অবস্থানরত রাষ্ট্রদূতকে এভাবে মূল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে এনে রাজধানী বা নিজ দেশে অবস্থান করতে বলা কূটনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। সাধারণত রাষ্ট্রদূতরাই স্বাগতিক দেশের পররাষ্ট্র দপ্তর ও রাষ্ট্রপ্রধানের দপ্তরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে সফরের প্রোটোকল এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈঠকের চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণ করেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি সরকারি কর্মসূচি এমন নিখুঁত ও বিকল্পভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সেখানে দাউদ আলীর উপস্থিতির কোনো বাধ্যবাধকতা বা প্রয়োজন না থাকে।
হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ নিয়ে ঢাকার প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক পাড়ায় নানা আলোচনা ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তবে স্পর্শকাতর এই পরিবর্তনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি নির্দেশে মো. দাউদ আলীকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় সদর দপ্তরে তলব করা হয়েছিল। মন্ত্রণালয় থেকে বার্তা পাওয়ার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে টোকিও ত্যাগ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করলেও প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে জাপানে যাওয়ার সুযোগ থেকে তিনি পুরোপুরি বাইরে থাকছেন।
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন, নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী দেশ। মেগা প্রকল্প, বৃহৎ অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি আলোচনা বাস্তবায়নে টোকিও দূতাবাসের ভূমিকা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এমন এক কৌশলগত উন্নয়ন সহযোগীর দেশে শীর্ষ সফর আয়োজনের মুহূর্তে শীর্ষ কূটনীতিকের এই অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এমনকি টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে মো. দাউদ আলীকে এখনো জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবেই নাম ও পদবিসহ বহাল থাকতে দেখা গেছে।
ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিচয়ে মো. দাউদ আলী বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। ১৯৯৫ সালের নভেম্বরে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন এবং দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে বিভিন্ন দেশে ও সংস্থায় সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ২৬ ডিসেম্বর তাঁর অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার সময় নির্ধারিত রয়েছে। টোকিওতে শীর্ষ কূটনৈতিক দায়িত্ব পাওয়ার পূর্বে তিনি রুমানিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োজিত ছিলেন। সেই সময়ে তিনি একই সাথে মলদোভা, উত্তর মেসিডোনিয়া ও বুলগেরিয়াতেও বাংলাদেশের অতিরিক্ত রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২০ সালের মার্চ মাসে তাঁকে রোমানিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। এরও আগে চীনের কুনমিংয়ে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
সুদীর্ঘ পেশাদারি ক্যারিয়ারের একদম শেষ প্রান্তে এসে অবসর গ্রহণের মাত্র দু-এক মাস বাকি থাকতে এত বড় একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সফরের মুখ থেকে দাউদ আলীকে ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি থেকে দূরে রাখা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রোটোকলের বিচারে বড় এক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর উচ্চপর্যায়ের সফরের মূল উদ্দেশ্য ও সাফল্য বজায় রাখতে সচিব পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে টোকিও পাঠিয়ে পরিস্থিতি যেভাবে সামাল দেওয়া হচ্ছে, তা পরিস্থিতি কতটা স্পর্শকাতর ও জরুরি ছিল সেটাই তুলে ধরে। সব মিলিয়ে টোকিওর কূটনৈতিক মঞ্চে দাউদ আলীর অনুপস্থিতি এবং সচিব নজরুল ইসলামের সফর ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করার ঘটনাটিকে ঢাকার বৈদেশিক নীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত