প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে মাত্র এক রাতের ব্যবধানে এক নজিরবিহীন ও সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেখানে পর পর সাতটি জ্বালানি তেলবাহী বাণিজ্য জাহাজে ভয়াবহ হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা ও বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করে তথ্য নিশ্চিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যখন আবারও একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বাত্মক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা কাজ করছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের মূল রুটটিতে ইরান সমর্থিত আইআরজিসির এই বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ জলসীমায় আক্রান্ত এই সাতটি বহুজাতিক জাহাজের মধ্যে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ পানিতে পেতে রাখা বিপজ্জনক নৌ–মাইনের (Naval Mines) আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিকল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বাকি চারটি জাহাজে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের অভিজাত নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনী ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ (আইআরজিসি)। হামলার তীব্রতায় জাহাজগুলোতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায় এবং রাতের অন্ধকার চিরে আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে। এক রাতের মধ্যে এত বিশালসংখ্যক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে সরাসরি সামরিক হামলা চালানোর ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির বড় ধরনের লক্ষণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
ইরানি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, হামলার শিকার হওয়া প্রতিটি জাহাজই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ উৎসাহ, ইন্দন ও নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে এসব জাহাজ বিপজ্জনক জানা সত্ত্বেও বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ও হুঁশিয়ারি তোয়াক্কা না করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছিল। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক নতুন সামরিক রণনীতি বা সামুদ্রিক ডকট্রিন ঘোষণা করেছে আইআরজিসি। ইরানের নতুন এই নীতি অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর কিংবা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সমুদ্র সীমায় কোনো ধরনের সামুদ্রিক অবরোধ আরোপ করার চেষ্টা করা হলে, সেটিকে তেহরান সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা বা ‘অ্যাক্ট অব ওয়ার’ হিসেবে বিবেচনা করবে।
ইরানের নতুন সামরিক বার্তা স্পষ্ট করেছে যে, তেহরান সরকার এখন আর যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো সামরিক আক্রমণের অপেক্ষা করে পরোক্ষ জবাব দেবে না; বরং যেকোনো আগাম চোখরাঙানি বা ব্লকেড তৈরির চেষ্টাকে তারা তাৎক্ষণিক সামরিক জবাবের আওতায় নিয়ে আসবে। এই নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই আইআরজিসি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্রদের সহায়তায় হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা যেকোনো মার্কিন সংশ্লিষ্ট জাহাজকেই এখন থেকে উন্মুক্ত নিশানা হিসেবে গণ্য করা হবে। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনকারী তেলবাহী জাহাজগুলো যখন এই প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করবে, তখন তেহরান তাদের হুমকি কতদূর নিয়ে যায় এবং কীভাবে তার জবাব দেয়—সেটিই এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নিবিড় ও নিরপেক্ষ তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত নথিপত্রে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালির অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকীর্ণ জলসীমায় বৃহস্পতিবার রাতে আক্রান্ত এই সাতটি বহুজাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের মধ্যে তিনটি বিশালাকার তেলবাহী ট্যাঙ্কার পানিতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পেতে রাখা বিপজ্জনক সামুদ্রিক নৌ-মাইনের (Naval Mines) মারাত্মক আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে বিকল হয়ে পড়ে। পানির নিচে বিস্ফোরণের পরপরই জাহাজগুলোর ইঞ্জিনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেগুলো সাগরে ভাসতে থাকে। অন্যদিকে বাকি চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে সরাসরি দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোন এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের অভিজাত নিরাপত্তা ও বিশেষ সামরিক শাখা ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ (আইআরজিসি)। আইআরজিসির চালানো সরাসরি সামরিক আক্রমণের তীব্রতায় প্রতিটি জাহাজের উপরিভাগ ও জ্বালানি ট্যাঙ্কে দাউ দাউ করে ভয়াবহ আগুন ধরে যায় এবং রাতের গাঢ় অন্ধকার চিরে আকাশের বহুদূর পর্যন্ত ঘন কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। একটি মাত্র রাতের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক এতগুলো বাণিজ্যিক জাহাজে একই সঙ্গে সরাসরি সামরিক হামলা চালানো ও নৌ-মাইন দিয়ে বিকল করে দেওয়ার এই ঘটনাকে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক সামরিক উত্তেজনা হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
ইরানি সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কমান্ডের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মাধ্যমে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এক রাতে আক্রমণের শিকার হওয়া প্রতিটি জাহাজই কোনো না কোনোভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিল। তেহরানের গোয়েন্দা দপ্তরের সুনির্দিষ্ট দাবি, পারস্য উপসাগরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন সরকারের প্রত্যক্ষ অভয়, রাজনৈতিক উৎসাহ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মৌখিক আশ্বাস পেয়েই এসব বাণিজ্যিক জাহাজ অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি জানা সত্ত্বেও কোনো তোয়াক্কা না করে স্বগর্বে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার ঝুঁকি নিয়েছিল। সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের অব্যাহত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আগ্রাসী সামরিক পদক্ষেপের কঠোর জবাব দিতে এক নতুন ও অভূতপূর্ব সামুদ্রিক ডকট্রিন বা সামরিক নীতি ঘোষণা করেছে আইআরজিসি। তেহরানের নতুন এই নীতিতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বা পারস্য উপসাগরীয় আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানের তেল রপ্তানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর যেকোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামুদ্রিক অবরোধ (Naval Blockade) কিংবা কড়াকড়ি আরোপের চেষ্টা করা হলে, সেটিকে তেহরান কোনো সাধারণ কূটনৈতিক বিবাদ হিসেবে দেখবে না; বরং সেটিকে সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ঘোষণা বা ‘অ্যাক্ট অব ওয়ার’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
ইরানের সর্বাধিনায়কদের প্রবর্তিত এই নতুন সামরিক অবস্থান বৈশ্বিক সামরিক মানচিত্রে এক বিশাল বড় পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা বহন করছে। এই নীতির ফলে তেহরান সরকার এখন আর যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আগে তাদের মাটিতে বা নৌঘাঁটিতে আক্রমণ চালানো পর্যন্ত অপেক্ষা করে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ আত্মরক্ষামূলক জবাব দেবে না; বরং তাদের সার্বভৌমত্ব বা সমুদ্রসীমায় কোনো আগাম ব্লকেড তৈরি করার সুনির্দিষ্ট লক্ষণ বা উসকানি দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে আগাম আগ্রাসী সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এই কঠোর নীতি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই আইআরজিসির নৌ-কমান্ড স্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন বা তাদের পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় কিংবা সমর্থনে প্রলুব্ধ হয়ে যারা হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করবে, সেই সকল মার্কিন সংশ্লিষ্ট নৌযানকেই এখন থেকে রণক্ষেত্রে উন্মুক্ত ও বৈধ সামরিক নিশানা (Valid Military Target) হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আগামী দিনগুলোতে যখন আরও আন্তর্জাতিক তেলবাহী ও বাণিজ্যিক জাহাজ এই সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের ঝুঁকিপূর্ণ চেষ্টা চালাবে, তখন ইরানি রেভোল্যুশনারি গার্ডস তাদের এই হুমকি বাস্তবে কতটা মারাত্মক রূপ দেয় এবং বৈশ্বিক নৌশক্তিগুলো কীভাবে তার মোকাবিলা করে—সেটিই এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্ব বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিতে, পারস্য উপসাগরের এই নজিরবিহীন ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ওয়াশিংটন ডিসি এবং তেল আবিবের সামরিক ও নিরাপত্তা গোয়েন্দারা যৌথ সতর্কবার্তা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য জাহাজে সরাসরি হাত দিয়ে ইরান বিশ্ব সংঘাতের একদম শেষ সীমান্তে পৌঁছে গেছে এবং যেকোনো মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক ফ্রন্টে আবারও এক তীব্র ও রক্তক্ষয়ী সর্বাত্মক সামরিক সংঘাত এবং সর্বাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সম্ভাব্য যৌথ সামরিক হামলা কিংবা বিমান হামলার জোরালো খবরের মধ্যে ইরানও তাদের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি ও নৌবহরকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় (High Alert) রেখে যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক নীতি নির্ধারকরা স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর যেকোনো ধরনের সামরিক দুঃসাহস বা বেপরোয়া আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার শতভাগ প্রযুক্তিগত, সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত ও সংকীর্ণ সামুদ্রিক জলসীমায় দুই পরাশক্তির মুখোমুখি অবস্থান, রণতরীর টহল এবং বারুদের উত্তপ্ত বাষ্পে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি, শেয়ারবাজার ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজারে এখন এক তীব্র আতঙ্কের প্রকম্পন সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব যৌথভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করে সতর্ক করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো মুহূর্তে আবার বড় ধরনের সর্বাত্মক সামরিক সংঘাত ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে ইরানও তাদের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন এবং যেকোনো সম্ভাব্য হামলা সামাল দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে। তেহরানের উচ্চপদস্থ নেতৃত্ব স্পষ্টভাষায় বার্তা দিয়েছে যে, কোনো শক্তির সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার পূর্ণ সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ইরানের রয়েছে। দুই মেরুর এই সামুদ্রিক মুখোমুখি অবস্থানে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে এখন চরম অস্থিরতা ও আতঙ্কের দাহ্য বাতাস বইছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত