প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সৌদি আরবে আকস্মিকভাবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনার পর তাদের বিস্তারিত তথ্য ও মামলার রায়ের অনুলিপি চেয়ে রিয়াদকে চিঠি পাঠালেও এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর পায়নি বাংলাদেশ সরকার। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঢাকা কূটনৈতিক চ্যানেলে সার্বক্ষণিক আলোচনা অব্যাহত রেখেছে এবং পুরো ঘটনার মূল সত্যতা উদ্ঘাটনে আইনি নথিপত্র হস্তান্তরের জোর দাবি জানিয়েছে। সরকারের পক্ষে এই কূটনৈতিক উদ্যোগের সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। রিয়াদ ও ঢাকার মধ্যকার এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল যুদ্ধাবস্থায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় সরকারের গৃহীত নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের চরম সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে হুথিদের সামরিক হামলায় প্রাণ হারানো বাংলাদেশি প্রবাসী শাহেদ আহম্মদের মরদেহ দেশে পৌঁছালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পর রাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে মুখোমুখি হন। নিহত প্রবাসীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়ার সময় প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, সৌদি আরবে যে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর করা হয়েছে, সেই বিষয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা রিয়াদের পক্ষ থেকে এখনো নতুন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ঢাকা পায়নি। ঘটনাটির পেছনের মূল কারণ, মামলার বিবরণ এবং আইনি রায় জানার জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি সরকারের কাছে আইনি অনুলিপি চেয়েছে। উক্ত রায়ের অনুলিপি হাতে আসলেই কেবল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঠিক পটভূমি ও আইনি বাস্তবতা স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হবে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার কূটনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ১৫ অক্টোবর সৌদি আরবের একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটি। ঘটনাটির পর পরই প্রবাসীদের অধিকার সুরক্ষা ও মামলার নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল থেকে তথ্য চেয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরি কূটনৈতিক পত্র প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হলে গত ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সরাসরি তলব করে বাংলাদেশ সরকার। সে সময় সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে উক্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, আনা অভিযোগ এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ও তথ্য হস্তান্তর করার কড়া কাইনি তাগিদ দেওয়া হয়।
বিমানবন্দরে প্রয়াত প্রবাসীর লাশ হস্তান্তরের সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে হুথিদের হামলায় নিহত শাহেদ আহম্মদের শোকার্ত পরিবারকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি যাতে ভবিষ্যতে কোনো আর্থিক সংকটে না পড়ে, সে লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে যাবতীয় রাষ্ট্রীয় সাহায্য ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সেই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া চরম সংঘাত, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে এ পর্যন্ত অন্তত ১১ জন বাংলাদেশি নাগরিকের নিথর দেহ দেশে ফেরত এসেছে, যা পুরো দেশের জন্য এক চরম বেদনার বিষয়।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়া চরম সামরিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ইয়ামেনভিত্তিক হুথিদের ছোড়া সামরিক হামলায় মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক শাহেদ আহম্মদ। শুক্রবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রয়াত প্রবাসীর লাশ পৌঁছালে সেখানে নিহতের পরিবারের স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে এবং লাশ হস্তান্তর কার্যক্রমে উপস্থিত হন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বিমানবন্দরে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবে যে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড সম্প্রতি কার্যকর করা হয়েছে, সেই বিষয়ে সৌদি সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে এখনো নতুন করে কোনো অফিসিয়াল ব্যাখ্যা বা তথ্য ঢাকা এসে পৌঁছায়নি। পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এই ঘটনার পেছনের মূল বাস্তবতা, অপরাধের প্রকৃতি ও বিচারিক নথিপত্র জানতে দেশটির সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। ঘটনার মূল কারণ জানতে আদালতে প্রদত্ত চূড়ান্ত রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে; কারণ নথিপত্র হাতে না আসা পর্যন্ত মামলার প্রকৃত ঘটনা বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়।
কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সূত্রের নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, এই উদ্বেগজনক ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৫ অক্টোবর। ওই দিন সৌদি আরবের একটি স্থানীয় মসজিদে অনৈতিক ও বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার স্পর্শকাতর ও গুরুতর অভিযোগে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশি নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে তা কার্যকর করে দেশটি। ঘটনাটির পরপরই আন্তর্জাতিক প্রটোকল ও নিজ দেশের নাগরিকদের মানবাধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল থেকে জরুরিভিত্তিতে চিঠি পাঠানো হয় সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। চিঠিতে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের পেছনে নির্দিষ্ট অভিযোগের বিবরণ, দায়েরকৃত মামলা এবং আদালতের দেয়া চূড়ান্ত দণ্ডাদেশ সম্পর্কিত সব তথ্য চেয়েছে কনস্যুলেট। পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর রূপ নিলে গত ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। সে সময় সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে উক্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণ, অভিযোগের স্বচ্ছতা এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় সংক্রান্ত বিশদ তথ্য হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কড়া কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়।
বিমানবন্দরে নিহত প্রবাসী শাহেদ আহম্মদের মরদেহ স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবে হুথিদের হামলায় অকালে প্রাণ হারানো শাহেদের শোকার্ত পরিবারকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক রাষ্ট্রীয় আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। এই অসহায় পরিবারটির সার্বিক ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার যা যা করার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তার ঝুঁকি তুলে ধরে জানান, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ইসরায়েল ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের কারণে একের পর এক নিরীহ বাংলাদেশি প্রবাসীর প্রাণহানি ঘটছে। এই আঞ্চলিক সংঘাত ও হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ১১ জন বাংলাদেশি প্রবাসীর নিথর দেহ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যা জাতীয়ভাবে এক গভীর শোকের আবহ তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে সেখানে কর্মরত লক্ষ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশি যে নানামুখী চরম সংকট ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছেন, তা কাটিয়ে উঠতে সরকারের বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, যুদ্ধের ভয়াবহতায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অস্থিতিশীল দেশে ভিটেমাটি ও কর্মস্থলে আটকে পড়েছেন বহু বাংলাদেশি শ্রমিক, যাঁর মধ্যে অনেকেরই ভিসার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে বা শেষের পথে। এসব আটকে পড়া প্রবাসীরা যাতে কোনো ধরনের আইনি জটিলতা কিংবা বেআইনি অনুপ্রবেশের দায়ে না পড়েন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে তাঁদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি যুদ্ধের ঘনঘটার কারণে যেসব প্রবাসী শ্রমিক আর ওই সব দেশে ফিরতে পারছেন না কিংবা চাকরি হারিয়েছেন, তাঁদের কীভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ও শিল্পখাতে পুনর্বাসিত করা যায়, তা নিয়েও নীতিগত কাজ করছে সরকার। এছাড়া সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে দীর্ঘ দিন ধরে নানা ছোট-বড় অপরাধ ও আইনি জটিলতায় বন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি নাগরিক। সৌদি কারাগারে বন্দী এই বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর মুক্তি নিশ্চিত করতে ও তাঁদের প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করেন প্রতিমন্ত্রী।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যে বহুমুখী অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে সরকারের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি জানান, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ দেশে আটকে পড়া হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। এসব আটকে পড়া প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ কীভাবে সহজ প্রক্রিয়ায় বাড়ানো যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে ঢাকা নিবিড়ভাবে কাজ করছে। এছাড়া উদ্ভূত বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে যেসব প্রবাসী শ্রমিক আর কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারছেন না, তাঁদের পুনর্বাসিত করতে এবং দেশীয় কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্ত করতে বিকল্প রূপরেখা তৈরি করছে সরকার। এর পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে দীর্ঘদিন বন্দী অবস্থায় থাকা প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি প্রবাসীর আইনি সহায়তা প্রদান ও মুক্তি নিশ্চিতেও কাজ চলছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত