“গোয়েন্দা সংস্থা সংস্কারে দেরি, রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক”

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫
  • ৯৭ বার

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ে বিদেশি গোয়েন্দাদের অনুপ্রবেশের তথ্য সামনে এসেছে, যা দেশীয় নিরাপত্তার প্রতি গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ২০০৯ সালের পর থেকে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে বিদেশি চক্রের হাতে চলে গেছে। জাতীয় মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা দেশের কর্মকর্তাদের অনেকেই নিজেদের নৈতিক ও পেশাদারী দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে স্বার্থনির্ভর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এমনকি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ডিজিএফআই-এর এক তলাও বিদেশি গোয়েন্দাদের কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাষ্ট্রের নীরব কিন্তু প্রভাবশালী রক্ষক। এরা সরকারের নীতি-প্রক্রিয়া, সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাস, অর্থনৈতিক হুমকি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জাতীয় কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। তাই এই সংস্থাগুলোর সংস্কার এখন বিলাসিতা নয়, বরং দেশের মৌলিক নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, পেশাদার, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ গোয়েন্দা কাঠামোর অভাবে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মূলত রাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গঠিত। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের ব্যবহার হয়েছে। বিরোধী দলের আন্দোলন দমন, নির্বাচনী প্রভাব এবং ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণকে ‘মূল কাজ’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা সংস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করেছে। এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহার রাষ্ট্রের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।

গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রম যদি রাষ্ট্রের স্বার্থ থেকে বিচ্যুত হয়, তবে সীমান্তে চোরাচালান, বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা অব্যাহত থাকে। ফলে রাষ্ট্র ও জনগণের ওপর ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। অতএব, গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কারকে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্কার হিসেবে দেখা আবশ্যক।

১৯৭০ সালের পূর্ব পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দেয় যে গোয়েন্দা ব্যর্থতা দেশের ভবিষ্যতকে বিপন্ন করতে পারে। সেই সময় সঠিক গোয়েন্দা তথ্য না পাওয়ায় রাষ্ট্রের বিভাজন ঘটেছিল। বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতিতেও একই ধরনের প্রভাব পড়তে পারে যদি সংস্থাগুলো নিরপেক্ষ ও পেশাদার না থাকে।

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার নিয়োগ ও নীতিনির্ধারণে ভারতের হস্তক্ষেপ ক্রমবর্ধমান হয়েছে। এটি সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নষ্ট করেছে। বিদেশি সহযোগিতা অবশ্যই থাকতে পারে, তবে একতরফা প্রভাব বা নির্ভরতা জাতীয় নিরাপত্তার বিপক্ষে কাজ করে।

গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কারের জন্য প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো, যেখানে কাজের ক্ষেত্র, দায়িত্ব, নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। ডিজিএফআই, এনএসআই এবং অন্যান্য বিশেষায়িত সংস্থাগুলোকে আলাদা লক্ষ্য ও দায়িত্বে নিয়োজিত করা প্রয়োজন। সামরিক গোয়েন্দা, অর্থনৈতিক-প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, সন্ত্রাস প্রতিরোধ ও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পৃথক yet সমন্বিত কাঠামো থাকা জরুরি।

বর্তমান সরকারের ছয়টি সংস্কার কমিটির মধ্যে গোয়েন্দা সংস্কার অন্তর্ভুক্ত না হওয়া গভীর উদ্বেগের বিষয়। প্রশাসন, নির্বাচন বা বিচারিক সংস্কার কার্যকর হবে না যদি তথ্য সরবরাহকারী সংস্থাগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না থাকে। আলোচনাভিত্তিক আইনপ্রণয়নের মাধ্যমে সংস্থার এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষা, স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি, শক্তিশালী কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স, আধুনিক প্রযুক্তি এবং মাল্টি-লেয়ার্ড সিকিউরিটি কাঠামো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

গোয়েন্দা সংস্থা রাষ্ট্রের মস্তিষ্ক। যদি তা মেরুদণ্ডহীন হয় বা বিদেশি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে চলে যায়, তবে সিদ্ধান্তই রাষ্ট্রের স্বার্থের বিপরীতে যাবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য প্রয়োজন এনএসআই ও ডিজিএফআইকে কেবল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত করা। শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও আধুনিক গোয়েন্দা ব্যবস্থা হলো জাতির নিরাপত্তার মূল প্রহরী এবং ভবিষ্যৎ সংরক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত