প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
”আমি কি সত্যিই সুখী, নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডে ভেসে এক অজানা মানসিক সংকটে জড়িয়ে পড়ছি”
আধুনিক যুগে সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সম্পর্কের টানাপোড়েন, এমনকি পারিবারিক বা ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোও অনেকেই এখন নিঃসংকোচে শেয়ার করছেন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অতি-শেয়ারিং সংস্কৃতি ধীরে ধীরে একধরনের মানসিক সংকট বা “ডিজিটাল আবেগ-নির্ভরতা” (Emotional Dependency Disorder) তৈরি করছে, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই উদ্বেগজনক।
সোশ্যাল মিডিয়ার ‘লাইক’ ও ‘কমেন্ট’ এখন অনেকের আত্মমর্যাদার পরিমাপক হয়ে উঠেছে। নিজের ব্যক্তিগত জীবনের ছোটখাটো বিষয়, এমনকি পারিবারিক সমস্যা বা সম্পর্কের টানাপোড়েনও প্রকাশ করা যেন একটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ট্রেন্ড কি সত্যিই মানসিক স্বস্তি দেয়, নাকি এটি ধীরে ধীরে আমাদের আবেগের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিচ্ছে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা নাসরিন মনে করেন, “যখন কেউ নিয়মিত নিজের ব্যক্তিগত জীবন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করতে থাকে, সেটি একধরনের অচেতন মানসিক নির্ভরতার ইঙ্গিত দেয়। মানুষ তখন নিজের বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার বদলে ভার্চুয়াল প্রশংসা বা সহানুভূতি খোঁজে। এতে আত্মসম্মান ও বাস্তব সম্পর্ক দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন অন্তত তিন ঘণ্টা সময় দেন সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং ব্যক্তিগত বিষয় নিয়মিত পোস্ট করেন, তাদের মধ্যে ৬৭ শতাংশই আবেগ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, উদ্বেগ বা একাকীত্বে ভোগেন। মনোবিজ্ঞানীরা একে “ট্রেন্ড-চালিত মানসিক অস্থিরতা” বলে উল্লেখ করেছেন, যেখানে মানুষ সচেতনভাবে নয়, বরং সামাজিক প্রতিক্রিয়ার প্রত্যাশায় নিজের গোপনীয়তাকে বিসর্জন দেন।
একসময় পরিবার, বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের কাছেই কেউ নিজের দুঃখ ভাগ করতেন। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ভার্চুয়াল অনুসারীরা। কেউ কেউ বলেন, এটি আধুনিকতার প্রকাশ; আবার অনেকেই মনে করেন, এটি এক ধরনের মানসিক অবসাদের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে মানুষ বাস্তব আবেগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘অনলাইন প্রশংসা’তে আসক্ত হয়ে পড়ে।
সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা নতুন এক সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করছে। এখন মানুষ নিজের সুখ প্রকাশের আগে ভাবছে না, তা অন্যের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে। কেউ নিজের সাফল্য বা সম্পর্কের রোম্যান্স দেখিয়ে অন্যের জীবনে অনিচ্ছাকৃত চাপ সৃষ্টি করছেন। আবার কেউ নিজের কষ্ট বা একাকীত্ব বারবার প্রকাশ করে নিজেকে অজান্তেই মানসিকভাবে আরও দুর্বল করে তুলছেন।
একজন তরুণ মনোবিজ্ঞানী বলেন, “আজকের প্রজন্মের অনেকেই নিজেদের জীবনের প্রতিটি অনুভূতিকে প্রকাশ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন, প্রতিটি প্রকাশ আসলে নিজের মনোজগতের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। যা থেকে জন্ম নিচ্ছে নিঃসঙ্গতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং তুলনামূলক চিন্তায় বিষণ্নতা।”
সোশ্যাল মিডিয়ার এই মানসিক ফাঁদ থেকে মুক্ত থাকতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ব্যক্তিগত জীবনকে যতটা সম্ভব নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। আনন্দ বা দুঃখ ভাগ করা স্বাভাবিক, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তকে জনসমক্ষে তুলে ধরা মানসিক ভারসাম্যকে নষ্ট করতে পারে। জীবনের আসল সুখ খুঁজে নিতে হলে বাস্তব সম্পর্ককে লালন করতে হবে—ভার্চুয়াল প্রশংসায় নয়, বাস্তব ভালোবাসা ও আত্মসম্মানে।
আমি কি সত্যিই সুখী, নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডে ভেসে এক অজানা মানসিক সংকটে জড়িয়ে পড়ছি?