দাবি পূরণ হলে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে এনসিপি: হাসনাত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩১ বার
বাংলাদেশে দিল্লির আধিপত্য মানা হবে না: হাসনাতের হুঁশিয়ারি

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বহুল আলোচিত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি শুক্রবার সকালে ঘোষণা দিয়েছে, তারা আজকের অনুষ্ঠানে অংশ নেবে না। তবে নিজেদের দাবি পূরণ হলে পরবর্তীতে সনদে স্বাক্ষর করতে পারে— এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ।

রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঘোষণা বেশ আলোড়ন তুলেছে, কারণ জুলাই সনদকে ঘিরে জাতীয় ঐকমত্য গঠনের প্রক্রিয়ায় এনসিপির উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছিল। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে এই সনদকে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক রূপরেখা, নির্বাচনপদ্ধতি, নাগরিক অধিকার ও প্রশাসনিক সংস্কারের নীতিনির্দেশনা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শুক্রবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ লেখেন, “জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে না জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। যেহেতু এ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে আইনি ভিত্তি অর্জন হবে না, এটা কেবল আনুষ্ঠানিকতা। আমরা বহুবার আইনি ভিত্তির কথা বলেছি। তাই আইনি ভিত্তির পূর্বে এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ‘জুলাই ঘোষণাপত্রের’ মতো আরেকটি একপাক্ষিক দলিলে রূপান্তর হবে।”

তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, এনসিপি মূলত “আইনি স্বীকৃতি” ও “দাবি বাস্তবায়ন”-এর নিশ্চয়তা ছাড়া এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে চায় না। হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, “তবে ঐকমত্য কমিশন যেহেতু সময় বৃদ্ধি করেছে, আমরা কমিশনের পরবর্তী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে আমাদের অবস্থান তুলে ধরবো। দাবি পূরণ হলে পরবর্তীতে স্বাক্ষর করবে এনসিপি।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত জুলাই সনদকে ঘিরে জাতীয় ঐকমত্যের প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দিয়েছে। কারণ, এনসিপি প্রথম থেকেই এই সনদের আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল এবং নাগরিক অংশগ্রহণ ও বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়গুলোতে দলের প্রস্তাবগুলো আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু এখন তারা যদি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকে, তবে এটি সনদের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে সরকারপক্ষ এবং প্রধান উপদেষ্টার দফতর থেকে এখনও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বৃহস্পতিবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় আহ্বান জানান, সব রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠন ও গণমাধ্যম যেন শুক্রবারের জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করে এবং “ঐক্য ও আশার এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে” সবাই যেন অংশ নেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনসিপির এই অবস্থান কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং এটি দলটির দীর্ঘদিনের নীতি ও দাবি বাস্তবায়নের চাপ সৃষ্টি করার একটি উপায়। এনসিপি বারবার বলেছে, “কোনো চুক্তি বা সনদ রাজনৈতিকভাবে নয়, আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।” অর্থাৎ, তারা এই সনদের “ঘোষণামূলক” প্রকৃতিকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং চাইছে এটি যেন বাস্তবায়নের স্পষ্ট আইনগত ভিত্তি পায়।

অন্যদিকে, এনসিপির ভেতরেও এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ভিন্নমত রয়েছে বলে জানা গেছে। দলের একাধিক সূত্র জানায়, অনেকেই মনে করছেন, অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক সুযোগ হারাতে পারেন। কারণ, জুলাই সনদকে ইতোমধ্যে অনেক রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সংগঠন দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রোডম্যাপ হিসেবে গ্রহণ করছে।

একটি সূত্র জানায়, এনসিপির কেন্দ্রীয় পরিষদের কয়েকজন সদস্য মনে করেন, “সনদে অংশ না নেওয়া মানে নিজেকে জাতীয় ঐকমত্যের বাইরে সরিয়ে নেওয়া, যা দলের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।” তবে হাসনাত আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ মহল থেকে জানানো হয়, “দল কোনো প্রতীকী স্বাক্ষর নয়, বাস্তব পরিবর্তনের নিশ্চয়তা চায়। দাবি পূরণ না হলে স্বাক্ষর অর্থহীন।”

রাজনৈতিক পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এনসিপি ২০২৪ সালের নাগরিক আন্দোলনের সময় থেকেই “জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা” ও “স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষমতায়ন”-এর দাবি তুলে আসছে। তারা বলছে, জুলাই সনদে এই বিষয়গুলোর স্পষ্ট প্রতিফলন না থাকলে এটি জনগণের স্বার্থরক্ষা করবে না।

এদিকে, শুক্রবার বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। এতে উপস্থিত থাকবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও কূটনৈতিক প্রতিনিধি। অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।

অনুষ্ঠানের আয়োজন ঘিরে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বড় বড় শহরের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে বড় পর্দা, যাতে মানুষ সরাসরি অনুষ্ঠানটি দেখতে পারে। তবে এনসিপির অংশ না নেওয়ার ঘোষণা এই উৎসবের আবহে কিছুটা প্রশ্ন তুলেছে— ঐক্যের এই প্রতীকী সনদ সত্যিই কি সব পক্ষকে একত্র করতে পারবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এনসিপির সিদ্ধান্ত সরকারকে আরও সংলাপ ও আলোচনার দিকে ঠেলে দেবে। কারণ, সনদ কার্যকর করতে হলে শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের পথও নির্ধারণ করতে হবে। আর সেই বাস্তবায়নের পথের প্রথম ধাপ হচ্ছে, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা।

রাজনীতির এ ক্রান্তিকালে এনসিপির এই অবস্থান একদিকে রাজনৈতিক বার্তা, অন্যদিকে বাস্তবতার প্রতিফলন। দলটি হয়তো আজকের অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকবে, কিন্তু তাদের এই ঘোষণা নিশ্চিতভাবেই জুলাই সনদ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এখন প্রশ্ন একটাই—এনসিপির দাবি কি পূরণ হবে, এবং তারা কি পরবর্তীতে এই ঐতিহাসিক সনদে স্বাক্ষর করবে? সময়ই সেই উত্তর দেবে। তবে আপাতত, জাতীয় ঐক্যের পথে এই অনুপস্থিতি যেন এক অনুচ্চারিত প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেল বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত