প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে টানা অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি পূরণের আশায় তারা “আমরণ অনশন” কর্মসূচি শুরু করেছেন, যা ক্রমে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। ইতোমধ্যে অসংখ্য শিক্ষক-কর্মচারী শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, অনেককে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করতেও হয়েছে। কিন্তু তবুও তাদের আন্দোলন থামছে না—বরং প্রতিদিন বাড়ছে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এবং দাবির প্রতি জনসমর্থন।
মঙ্গলবার সকালে তৃতীয় শ্রেণি কর্মচারী পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আদনান হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, অনশনে অংশ নেওয়া বহু শিক্ষক-কর্মচারীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছে। কিছু শিক্ষক অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন, কয়েকজনকে আইভি স্যালাইন দিতে হয়েছে। “আমরা জানি, এই লড়াই কষ্টের, কিন্তু আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না,” বলেন তিনি।
শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রধান তিনটি দাবি হলো—২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা, ১,৫০০ টাকা করে মেডিকেল ভাতা, এবং কর্মচারীদের জন্য ৭৫ শতাংশ উৎসব ভাতা প্রদানের সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা। এই তিন দাবির ভিত্তিতে তারা টানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। গত কয়েকদিন ধরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁবু গেড়ে অবস্থান করছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা, যাদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে এসেছেন।
আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করছেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়ন করছে না। এমপিওভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা সরকারি সুবিধার অনেক অংশ থেকে বঞ্চিত। “আমরা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করছি, অথচ নিজেদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। জীবনধারণই কঠিন হয়ে পড়েছে,” এক আন্দোলনরত শিক্ষক বলেন।
এর আগে রবিবার আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষকরা “ভুখা মিছিল” করেন। দুপুরে শিক্ষা ভবন অভিমুখে থালা-বাটি হাতে নিয়ে তারা “ক্ষুধার্ত শিক্ষকরা ন্যায্য অধিকার চায়” শ্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যান। পুলিশের বাধার মুখে তারা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন এবং সেখানেই বিক্ষোভ করেন।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে আংশিক ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। রবিবার অর্থ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়ি ভাতা মূল বেতনের ৫ শতাংশ (সর্বনিম্ন ২,০০০ টাকা) হারে প্রদানের বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে। চিঠিটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত তাঁদের দাবির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং তা “প্রতারণামূলক প্রতিশ্রুতি।”
শিক্ষক আন্দোলনের অন্যতম নেতা অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, “আমরা ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা দাবি করেছি, অথচ সরকার মাত্র ৫ শতাংশ দিয়েছে। এটি শিক্ষকদের সঙ্গে এক ধরনের তামাশা। আমরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছি না।”
অবস্থান কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় শিক্ষকরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে শাহবাগে নতুন কর্মসূচি পালন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, সরকারের কাছ থেকে লিখিত প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত আমরণ অনশন চলবে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে দেখা যায়, শত শত শিক্ষক ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে বসে আছেন। কেউ কুরআন তেলাওয়াত করছেন, কেউ চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছেন। কারও চোখে ক্লান্তি, কারও মুখে অটল সংকল্প। পাশে কয়েকজন শিক্ষক চিকিৎসা নিচ্ছেন—কারও রক্তচাপ কমে গেছে, কারও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তবুও তাঁরা অনশন ভাঙতে রাজি নন।
এদিকে, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছে। তারা সরকারের কাছে দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল খালেক বলেন, “শিক্ষকরা যদি ন্যায্য প্রাপ্য না পান, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যাবে। সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরকার শিক্ষকদের দাবি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, “অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে সব দাবি একসঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবে ধীরে ধীরে বাড়ি ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
অনশনে অংশ নেওয়া এক নারী শিক্ষক বলেন, “আমাদের পরিবার আমাদের ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছে, কিন্তু আমরা ফিরব না। যতক্ষণ না সরকারের পক্ষ থেকে লিখিত আদেশ আসছে, ততক্ষণ আমরা এখানেই থাকব।” তাঁর কণ্ঠে ক্লান্তি, কিন্তু সংকল্পে অনড়তা স্পষ্ট।
এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলন যেন আরও জোরালো হচ্ছে। শিক্ষা খাতের মানুষরা বলছেন, এই অনশন কেবল বেতন-ভাতার দাবি নয়, এটি বাংলাদেশের শিক্ষকদের অস্তিত্বের লড়াই। তাঁরা চান, সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান হোক, যাতে শিক্ষক সমাজ মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।