প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
অক্টোবর মাস প্রায় শেষের পথে, অথচ শীতের কোনো আভাসই মিলছে না। বরং দিন যত যাচ্ছে, তাপমাত্রা যেন উল্টো দিকেই বাড়ছে। খা খা রোদের তাপে পুড়ে যাচ্ছে নগর থেকে গ্রাম—সবখানেই মানুষ কান্ত, ক্লান্ত ও বিরক্ত। প্রকৃতির এই অস্বাভাবিক আচরণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে বাংলাদেশেও। প্রকৃতি যেন হারিয়ে ফেলেছে তার নিজস্ব ছন্দ ও ভারসাম্য।
প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠার পর থেকেই শুরু হয় অগ্নিঝরা গরমের দাপট। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলেও তাপমাত্রা উঠছে ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এমন গরমে যেন গলে যাচ্ছে পিচের রাস্তা, হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। অফিসগামী কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে রিকশাচালক, দিনমজুর, দোকানদার—সবাই এখন এই অস্বাভাবিক আবহাওয়ার চরম ভোগান্তিতে।
এদিকে গরমের সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিনই লোডশেডিং চলছে ঘন ঘন। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, ফলে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ মানুষ দিনরাত কাটাচ্ছে ভোগান্তির মধ্যে। ঘাম, গরম আর অন্ধকারে রাত পার করা এখন সাধারণ মানুষের নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই পরিস্থিতি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্রীষ্মকালোত্তর মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে সংকটের কারণে। পাশাপাশি তীব্র গরমের জন্য চাহিদাও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। এতে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই লোডশেডিং বেড়েছে। তবে তারা জানিয়েছে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে বিকল্প জ্বালানি উৎস ব্যবহারসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এ বছরের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে মৌসুম পরিবর্তনের যে ধারা সাধারণত দেখা যায়, তা এবার একেবারেই ব্যাহত হয়েছে। সাধারণত এই সময়টায় দেশে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে শীতল হাওয়া প্রবাহ শুরু হয়, আর্দ্রতা কমে আসে, আর ভোরবেলা কুয়াশার পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু এবার তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। আর্দ্রতা এখনও ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে, এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি বেশি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, “বর্তমান গরমের কারণ শুধু মৌসুমি বিলম্ব নয়, বরং এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রত্যক্ষ ফলাফল। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুমণ্ডলের অস্বাভাবিক আর্দ্রতা এবং নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট তাপদ্বীপ প্রভাব (Urban Heat Island Effect) একসাথে কাজ করছে।”
পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন, এমন অস্বাভাবিক জলবায়ু পরিস্থিতি শুধু অস্বস্তি নয়, বরং ভবিষ্যতে কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। ধান, সবজি ও ফলের মৌসুমি চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত গরমের কারণে হিটস্ট্রোক, ডায়রিয়া এবং ডেঙ্গু জ্বরের মতো রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা এখন এমন এক সময়ের মধ্যে রয়েছি, যেখানে মানুষের কৃত্রিম জীবনযাপন প্রকৃতির ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। শহরজুড়ে কংক্রিটের ভবন, বৃক্ষনিধন, বায়ুদূষণ ও অপ্রতুল সবুজায়ন মিলে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। এখন প্রকৃতি যেন মানুষের তৈরি ফাঁদে বন্দি হয়ে পড়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ নীতি বাস্তবায়ন জরুরি। নগর পরিকল্পনায় সবুজ জায়গা সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। নইলে আগামী বছরগুলোতে অক্টোবর নয়, নভেম্বর বা ডিসেম্বরেও শীতের দেখা পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠতে পারে।
মানুষের কৃত্রিম উন্নয়ন ও প্রকৃতির প্রতিশোধের এই বাস্তবতা এখন কেবল আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্নে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতি যে কেবল নীরব পর্যবেক্ষক নয়, তা হয়তো এখনই আমাদের স্পষ্টভাবে অনুভব করার সময় এসে গেছে।