প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকায় বৃহস্পতিবার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতা ও যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেছেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) রাজনৈতিক দলের প্রতীক তালিকায় শাপলা কলি যুক্ত করার মাধ্যমে এনসিপিকে “বাচ্চাদের দল” হিসেবে দেখিয়েছে। তিনি বলেন, কোন ধরনের আইনি কারণ ছাড়া কমিশন এই প্রতীক নির্বাচন করেছে, যা দলটির মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ মন্তব্য তিনি জাতীয় যুবশক্তির আয়োজনে এক সেমিনারে করেন।
সামান্তা শারমিন অভিযোগ করেন, বড় রাজনৈতিক দলগুলোও এনসিপিকে যথাযথ মর্যাদা দেয় না এবং এই পদক্ষেপ একটি ধরনের বৈষম্য প্রকাশ করে। তিনি বলেন, “এভাবে প্রতীক দেওয়া হয়েছে, যেন আমাদের দলকে ছোট করে দেখা হচ্ছে। এটি রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রতি অন্যায় এবং আমাদের নির্বাচনী মর্যাদা হ্রাস করার চেষ্টা।”
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সাংবাদিকদের জানান, কমিশন কীভাবে শাপলা কলি প্রতীক নির্বাচন করেছে তা তাদের বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, “তবে শাপলা প্রতীক নিয়ে আমরা আপসহীন। আমাদের দাবি, যে কোনো ধরনের বৈষম্য বা অযৌক্তিক প্রক্রিয়া প্রতিরোধ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের কাজ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত।”
এছাড়া মি. পাটওয়ারী উল্লেখ করেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রক্রিয়ায় বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট প্রকৃতপক্ষে নোট অব চিটিং হিসেবে কাজ করছে। তিনি বলেন, “জামায়াত মুখে জুলাই সনদের কথা বললেও তারা বাস্তবে নিন্মকক্ষে পিআরের কথা বলে আসন নিয়ে দরকষাকষি করছে। এটি এক ধরনের ভণ্ডামি।”
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে শাপলা কলি প্রতীকের অন্তর্ভুক্তির প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা দিয়েছেন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি জানান, তালিকার কিছু প্রতীক নিয়ে বিরূপ মন্তব্য আসায় সেগুলো বাদ দিয়ে নতুন প্রতীক যুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে শাপলা কলিও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “শাপলা আর শাপলা কলির ভিতর পার্থক্য আছে। কমিশন মনে করেছে সংশোধন করা দরকার, তাই করেছে। আমরা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা থাকায়ই নতুন প্রতীক তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।”
এতে উল্লেখযোগ্য যে, নির্বাচনী প্রতীকের তালিকায় শাপলা কলি যুক্ত হলেও এখনো কোনো রাজনৈতিক দলকে এই প্রতীক বরাদ্দ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতীক বরাদ্দের মাধ্যমে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তালিকায় প্রতীক সংশোধন এবং নতুন প্রতীক যুক্ত করা একটি প্রক্রিয়াগত পদক্ষেপ, যা কমিশনের স্বাধীনতা ও দায়িত্বের অংশ।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ আরও জানান, আগের তালিকায় ১১৫টি প্রতীক থাকলেও নতুন প্রতীক সংযোজন এবং কিছু প্রতীক বাদ দেয়ার পর তালিকায় সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৯। তিনি বলেন, “এই তালিকা সংশোধন করা হয়েছে যাতে প্রতীকগুলোর বৈচিত্র্য বজায় থাকে এবং রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা সহজে প্রতীক নির্বাচন করতে পারে।”
সামান্তা শারমিনের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ছোট দলগুলোকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মর্যাদা দেওয়া ও অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি প্রতীক বরাদ্দ ও নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গি দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক সমালোচকরা মনে করেন, এনসিপির অভিযোগ একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমস্যার প্রতিফলন। বড় দলগুলো প্রভাবশালী অবস্থান ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ছোট দলগুলোর সক্ষমতা ও প্রভাবকে সীমিত করতে পারে। নির্বাচনী প্রতীকের মাধ্যমে এমনভাবেই রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারিত হয়। সামান্তা শারমিনের বক্তব্য এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নির্বাচন কমিশন এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিরূপতা প্রকাশ করছে।
এনসিপি আরও উল্লেখ করেছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের ভোটার এবং সংগঠনের মধ্যে ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শাপলা কলি প্রতীকের বিষয়টি তাদের জন্য মর্যাদাহানির সমান এবং এটি নির্বাচনে সমান সুযোগ ও অংশগ্রহণের মৌলিক অধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনী প্রতীকের বিষয়টি কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, এটি ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও সৃষ্টি করে। প্রতীক হিসেবে ছোট বা কম পরিচিত চিহ্ন ব্যবহার করা হলে দলের সমর্থক এবং ভোটারদের মধ্যে প্রভাব এবং মনোযোগ সীমিত হতে পারে। এতে করে নির্বাচনী সমতা ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা প্রভাবিত হয়।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতীক তালিকার সংশোধন ও নতুন প্রতীক সংযোজন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রতীক নির্ধারণে কোনো রাজনৈতিক পক্ষের দাবির প্রাসঙ্গিকতা মূল বিষয় নয়। কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে। শাপলা কলি প্রতীক অন্তর্ভুক্তি সেই প্রক্রিয়ার অংশ।
সামান্তা শারমিন ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য এই নির্বাচনী বিষয়টি কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। তারা বলেন, “কোনও দলের প্রতি বৈষম্য বা অযৌক্তিক প্রক্রিয়া আমরা মানতে পারি না। আমাদের দাবি, প্রতীক বরাদ্দ ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং নিরপেক্ষ হতে হবে।”
শারমিনের বক্তব্যের সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একমত যে, ছোট দলগুলোর মর্যাদা রক্ষা করা, ভোটারদের মধ্যে স্বচ্ছ তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং প্রতীক বরাদ্দের মাধ্যমে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য। নির্বাচনী সমতা রক্ষায় কমিশন ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপ এবং স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে এনসিপি আশা প্রকাশ করেছে, নির্বাচন কমিশন তাদের মর্যাদা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে এবং শাপলা কলি প্রতীকের বিষয়টি নিয়ে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে তা সমাধান করা হবে। দলের নেতারা মনে করেন, ভোটাধিকার রক্ষা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে এবং সকল রাজনৈতিক দলের সমান সুযোগ বজায় থাকবে।
নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ ও এনসিপির প্রতিক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সামান্তা শারমিনের বক্তব্য নির্বাচনী সমতা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নকে নতুন আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ছোট দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও নির্বাচনী ফলাফলের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
সংক্ষেপে, শাপলা কলি প্রতীকের মাধ্যমে এনসিপি যে অভিযোগ তুলেছে তা কেবল প্রতীক বরাদ্দের বিষয় নয়, এটি নির্বাচনী সমতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ভোটারদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নকেও কেন্দ্র করে। এই ইস্যু দেশের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক ন্যায্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।