জুমার নামাজের মাঝেই ইন্দোনেশিয়ার মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, আহত অন্তত ৫৪

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৯ বার
জুমার নামাজের মাঝেই ইন্দোনেশিয়ার মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, আহত অন্তত ৫৪

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইন্দোনেশিয়ায় জুমার নামাজ চলাকালে মসজিদের ভেতরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, এতে অন্তত ৫৪ জন মুসল্লি আহত হয়েছেন। দেশটির রাজধানী জাকার্তার উত্তরের উপকণ্ঠ কেলাপা গাদিং এলাকায় নৌবাহিনীর একটি স্কুল মসজিদে শুক্রবার (৭ নভেম্বর) স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। মুহূর্তেই মসজিদজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও ধোঁয়া, আহতদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে প্রার্থনার স্থানটি।

ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, বিস্ফোরণের পরপরই উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা হয়। আহতদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতাল ও সামরিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মসজিদের ভেতরে থাকা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিংবা গ্যাসচালিত যন্ত্রপাতির ত্রুটি থেকেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নাশকতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কেলাপা গাদিং শহরের পুলিশ প্রধান আসেপ এদি সুহেরি স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি আহতের সংখ্যা ৫৪ জন। তাদের মধ্যে কারও অবস্থা আশঙ্কাজনক, আবার কেউ সামান্য পোড়া বা আঘাত পেয়েছেন। আমরা বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।”

তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থল ঘিরে রাখা হয়েছে এবং বিশেষজ্ঞ বোমা নিষ্ক্রিয় দল (বোম ডিসপোজাল ইউনিট) ও ফরেনসিক দল তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিস্ফোরণটি মসজিদের পেছনের অংশে, সম্ভবত সংরক্ষিত গ্যাস সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে ঘটেছে। তবে সবকিছু নিশ্চিত করতে ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

মসজিদের ভেতরে নামাজরত ছিলেন গণিত শিক্ষক বুদি লাকসোনো। তিনি ভয়ঙ্কর মুহূর্তটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “খুতবা শুরু হতেই আমরা হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনি। মনে হলো যেন পুরো মসজিদটা কেঁপে উঠল। মুহূর্তেই চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। শিশুরা চিৎকার শুরু করে, অনেকে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। কেউ কেউ অজ্ঞান হয়ে পড়ে।”

তার কণ্ঠে তখনো ভয় আর উদ্বেগ স্পষ্ট। তিনি বলেন, “আমি নিজেও বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। কয়েকজন ছাত্রকে বাইরে বের করে আনি, কেউ কাঁদছিল, কেউ আহত। আমি জীবনে এমন ভয়ংকর দৃশ্য কখনো দেখিনি।”

প্রত্যক্ষদর্শী আরও কয়েকজন মুসল্লি জানান, বিস্ফোরণটি ঘটে মসজিদের প্রধান নামাজ কক্ষের পেছনের অংশে। প্রথমে ধোঁয়া দেখা যায়, এরপরই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। ধোঁয়ার ঘন কুয়াশায় অনেকেই পথ হারিয়ে মসজিদের দরজা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বাইরে থেকে স্থানীয়রা ছুটে এসে দরজা খুলে দেয়, তখন উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।

কেলাপা গাদিংয়ের মেয়র রিনা মুলিয়ানি এক বিবৃতিতে বলেন, “এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও মর্মান্তিক। জুমার নামাজের মতো পবিত্র সময়ে এমন বিপর্যয় আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আহতদের চিকিৎসায় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক ও নার্সদের জরুরি ভিত্তিতে ডেকে নেওয়া হয়েছে।”

জাকার্তা পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। মসজিদের ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়েছে, দেয়ালের পেছনের অংশে বড় ধরনের ফাটল দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞ দল তদন্ত করছে, এটি গ্যাস বিস্ফোরণ নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে।

ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রাবোও সুবিয়ান্তো ঘটনাটির প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা, বিশেষ করে যখন এটি আমাদের নৌবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনায় ঘটেছে। আমরা চাই দ্রুত তদন্ত শেষ হোক এবং আহতদের পরিবার যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়।”

দেশটির প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোও ঘটনাটির পরপরই টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের প্রার্থনা সেই সকল মুসল্লিদের জন্য, যারা এই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। সরকার তদন্তের পূর্ণ দায়ভার নিয়েছে এবং আমরা নিশ্চিত করব, এমন দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে।”

জাকার্তার উত্তরের এই অঞ্চলটি মূলত সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিচিত। স্থানীয়রা জানান, শুক্রবারের জুমার নামাজে সাধারণত আশেপাশের শতাধিক ছাত্র, শিক্ষক এবং সামরিক কর্মী অংশ নেন। বিস্ফোরণ ঘটার সময় মসজিদে প্রায় ১৫০ জন উপস্থিত ছিলেন। বিস্ফোরণের পর মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে চিৎকার-চেঁচামেচি, ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপের গন্ধ।

স্থানীয় সময় বিকেল নাগাদ ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে সম্ভাব্য গ্যাস সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি উদ্ধার করে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে অন্তত ১৮ জনের শরীরের ৩০ শতাংশের বেশি অংশ পুড়ে গেছে, বাকিরা ধোঁয়া শ্বাস নেওয়ায় শ্বাসকষ্টে ভুগছেন।

আহতদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা প্রার্থনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বিকট শব্দ হয়। একজন মুসল্লি বলেন, “আমি সিজদায় ছিলাম, মনে হলো পেছন দিক থেকে বাতাসের ঝাপটা এলো। চোখ খুলতেই দেখি আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়া। সবাই প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিচ্ছে।”

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই মসজিদের ধ্বংসস্তূপ ও আহতদের ছবি শেয়ার করে হতাশা ও শোক প্রকাশ করেন। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, সামরিক এলাকায় অবস্থিত এমন একটি স্থাপনায় কীভাবে এত বড় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

ইন্দোনেশিয়া সরকার এরই মধ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, “ঘটনার প্রতিটি দিক বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হবে। যদি কোনো অবহেলা বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি পাওয়া যায়, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ইন্দোনেশিয়ায় গত এক দশকে এমন ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি। দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার রাষ্ট্র হলেও সাধারণত ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী থাকে। তবু এই বিস্ফোরণ নতুন করে নিরাপত্তা প্রটোকল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

দিনের শেষে, মসজিদের প্রাঙ্গণে তখনও পোড়া গন্ধ আর ধোঁয়ার ছায়া। স্থানীয় মুসল্লিরা জড়ো হয়ে আহতদের জন্য দোয়া করেন। ধ্বংসস্তূপে ছড়িয়ে থাকা জুতা, টুপি আর কোরআনের পাতাগুলো যেন সাক্ষ্য দিচ্ছিল সেই আতঙ্কঘন মুহূর্তের— যখন জুমার নামাজের পবিত্র স্থানে হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল পুরো মসজিদ।

একজন স্থানীয় বৃদ্ধ মুসল্লি কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “আমরা বাঁচলাম আল্লাহর রহমতে। কিন্তু এই ভয়, এই চিৎকার, এই দৃশ্য কোনোদিন ভুলতে পারব না।”

মসজিদের সেই ক্ষত এখন শুধু দেয়ালে নয়, গভীরভাবে আঁচড় কেটেছে এক শান্তিপ্রিয় সমাজের হৃদয়ে। ইন্দোনেশিয়া আজ শোকাহত, তবে একসঙ্গে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ— এমন দুর্ঘটনা আর কখনো ঘটতে দেওয়া যাবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত