প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য। ইরানের সঙ্গে চলমান সংবেদনশীল আলোচনা ও যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টার সময় তিনি এমন এক প্রস্তাব সামনে এনেছেন, যা পুরো অঞ্চলের কূটনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও জর্ডানের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে এবং তথাকথিত ‘আব্রাহাম চুক্তি’-তে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এত কষ্ট করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে, তাই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উচিত হবে একসঙ্গে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা। পরে আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, সৌদি আরব ও কাতারকে প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। যারা এতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদের এই বৃহৎ আঞ্চলিক উদ্যোগের অংশ হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালীর চলাচল স্বাভাবিক রাখা নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনার সঙ্গে ইসরাইলের স্বীকৃতির মতো স্পর্শকাতর বিষয় যুক্ত করা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
‘আব্রাহাম চুক্তি’ মূলত ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল এবং কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক কূটনৈতিক সমঝোতা। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের কাছে সম্মানিত নবী হজরত ইব্রাহিমের নাম অনুসারে এই চুক্তির নামকরণ করা হয়। এর মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। সেই সময় ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিল।
এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে এবং অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াবে। দূতাবাস স্থাপন থেকে শুরু করে পর্যটন, প্রযুক্তি ও সামরিক সহযোগিতার নতুন দ্বার খুলে যায় এর মাধ্যমে।
তবে বিষয়টি মুসলিম বিশ্বে এখনো অত্যন্ত বিতর্কিত। কারণ দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ আরব ও মুসলিম দেশ বলে এসেছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যাবে না। কিন্তু আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সেই অবস্থান অনেকাংশে বদলে যায়। এতে ফিলিস্তিনি ইস্যু কার্যত পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলো এখনো প্রকাশ্যে বলছে, ফিলিস্তিন সংকটের ন্যায়সঙ্গত সমাধান ছাড়া তারা ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করবে না। বিশেষ করে গাজায় চলমান যুদ্ধ, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং মানবিক সংকটের কারণে আরব বিশ্বের সাধারণ জনগণের মধ্যে ইসরাইলবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন বাস্তবতায় ট্রাম্পের প্রস্তাব রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের আবেগ, ধর্মীয় অনুভূতি এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নকে উপেক্ষা করে কোনো আঞ্চলিক জোট টেকসই হওয়া কঠিন।
ওয়াশিংটনের আরব গাল্ফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক আন্না জ্যাকবস বলেন, ইরান, গাজা ও লেবাননে চলমান সংঘাতের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো এ ধরনের চাপ সহজে মেনে নেবে না। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আরব রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন। এমন সময় তাদের ওপর নতুন কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা এবং জনগণের ক্ষোভকে তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফিলিস্তিন ইস্যু এখনো আরব জনগণের কাছে আবেগ ও ন্যায়ের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে শুধু রাজনৈতিক সমঝোতা দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
ইসরাইলে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরোও একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বা আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনার সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণকে যুক্ত করা অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে। তার মতে, প্রকাশ্যে চাপ প্রয়োগ করে আরব দেশগুলোকে লাইনে আনার কৌশল বাস্তবসম্মত নয়।
এদিকে ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, ভবিষ্যতে ইরানও একসময় এই চুক্তিতে যোগ দিতে পারে। তার ভাষায়, যদি এমনটা হয়, তবে সেটি হবে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলোর একটি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ যুদ্ধবিরতি আলোচনা চলাকালেই ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং মাইন বসানোর কাজে ব্যবহৃত নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এর ফলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার উত্তেজনা আবারও বেড়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু কূটনৈতিক চুক্তি যথেষ্ট নয়। ফিলিস্তিন সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক উত্তেজনা এবং জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ—সবকিছুকে বিবেচনায় নিয়েই টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে। অন্যথায় নতুন কোনো জোট বা সমঝোতা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আরও বড় অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।