যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা চলতেই ইরানে ফের মার্কিন হামলা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬
  • ৫১ বার
ইরানে ফের মার্কিন হামলা

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার আশার মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে আবারও সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সময় সোমবার রাতে চালানো এই হামলায় কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সমুদ্রে মাইন পেতে ব্যবহৃত নৌযান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এমন এক সময়ে এই হামলা চালানো হলো, যখন যুদ্ধ থামাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল। ফলে নতুন এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রচেষ্টাকে আরও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর আব্বাস এলাকায় বিস্ফোরণের খবর প্রথমে স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানায়, সমুদ্রে মাইন স্থাপন ও সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি ঠেকাতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানি বাহিনীর ব্যবহৃত কিছু নৌকা সমুদ্রপথে মাইন পেতে রাখার চেষ্টা করছিল এবং তা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারত।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আরও দাবি করেছে, তাদের সেনা ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ইরান এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং শান্তি আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করতে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।

ঘটনার সময় ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি এবং আঞ্চলিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছিল। তিন মাস ধরে চলমান সংঘাত বন্ধে একটি সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনার মধ্যেই এই হামলার ঘটনা ঘটায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা এগোলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। তার ভাষায়, কিছু অগ্রগতি হয়েছে মানেই চুক্তি খুব কাছাকাছি—এমন ধারণা ঠিক নয়। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলাকে উসকানিমূলক আখ্যা দেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ওয়াশিংটন এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখতে চায়। তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে “বিকল্প ব্যবস্থা” নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। তার মতে, বর্তমান আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথ নিরাপদ রাখা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের জন্য বড় অগ্রাধিকার।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে যেকোনো উত্তেজনা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। অতীতে ইরান একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, দেশটির ওপর সামরিক চাপ বাড়ানো হলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন হামলা আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা “ভালোভাবেই এগোচ্ছে”। তবে একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে আরও হামলা হতে পারে। তার ভাষায়, “হয় একটি ভালো চুক্তি হবে, না হলে কোনো চুক্তিই হবে না।”

ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। তিনি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর নাম উল্লেখ করে বলেন, এসব দেশকে তথাকথিত “আব্রাহাম চুক্তি”-তে যোগ দিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি আলোচনার সঙ্গে এই রাজনৈতিক শর্ত জুড়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

এর কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড নতুন হামলার বিস্তারিত প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ইরানি বাহিনীর সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধ করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তবে ইরানও পাল্টা দাবি করেছে, তারা একটি “শত্রু স্টেলথ ড্রোন” ভূপাতিত করেছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমের দাবি, নতুন ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাহায্যে ড্রোনটি গুলি করে নামানো হয়েছে। যদিও ড্রোনটি কোন দেশের ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।

একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল লেবাননেও উত্তেজনা বেড়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন, লেবাননে হামলা আরও জোরদার করা হবে। এর পরপরই লেবাননের বেকা উপত্যকাসহ বিভিন্ন এলাকায় হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় দেশটিতে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় দশ হাজার মানুষ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বহু আবাসিক এলাকা। ফলে মানবিক সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত বিস্ফোরণমুখী। একদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা, অন্যদিকে ইসরাইল-লেবানন উত্তেজনা—সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চল নতুন এক বড় সংঘাতের আশঙ্কায় রয়েছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করছেন তারা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com