প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে সারাদেশে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে গরু, ছাগল ও অন্যান্য গবাদিপশু নিয়ে আসতে শুরু করেছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ত্যাগের মহিমায় উদযাপিত এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর কোটি কোটি পশু কেনাবেচা ও কোরবানি হয়। তবে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, পশুর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতেও দেশে রয়েছে সুস্পষ্ট আইন ও বিধিমালা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পশু পরিবহন কিংবা কোরবানির সময় আইন না মানলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড—দুই ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে সংশ্লিষ্টদের।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। বিপরীতে চাহিদা রয়েছে প্রায় এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার পশুর। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখের বেশি পশু অতিরিক্ত রয়েছে। ফলে এবার দেশীয় খামারিদের উৎপাদিত পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।
তবে বিপুল সংখ্যক পশু দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শহর ও হাটে পরিবহন করার সময় প্রায়ই দেখা যায় অমানবিক পরিস্থিতি। অনেক ক্ষেত্রে একটি ট্রাকে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পশু তোলা হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবার ও পানি ছাড়া পশু পরিবহন করা হয়। কোথাও কোথাও পশুকে টেনে-হিঁচড়ে নামানো কিংবা আঘাত করার ঘটনাও ঘটে। এসব বন্ধে সরকার কয়েক বছর আগে ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২১’ এবং ‘প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯’ কার্যকর করে।
সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পশু কোরবানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধ্যতামূলক নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই একটি পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা যাবে না। কারণ এতে পশুর মধ্যে ভয় ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। একইসঙ্গে জবাইয়ের আগে পশুকে অন্তত ছয় ঘণ্টা বিশ্রামে রাখতে হবে। যদি কোনো পশু অতিরিক্ত উত্তেজিত বা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তাহলে তাকে শান্ত না করে জবাই করা যাবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসলামেও পশুর প্রতি সদয় আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরবানি শুধু মাংস সংগ্রহের বিষয় নয়, বরং এটি মানবতা, সহমর্মিতা ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়। তাই পশুর সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ ধর্মীয় মূল্যবোধেরও পরিপন্থি।
বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, জবাই করার পর পশুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো কিংবা শরীরের কোনো অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। এছাড়া কোরবানির অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে একজন নিবন্ধিত প্রাণিচিকিৎসকের মাধ্যমে। এতে রোগাক্রান্ত পশু শনাক্ত করা সহজ হবে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে।
পশু পরিবহনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিস্তারিত নির্দেশনা। আইন অনুযায়ী, একটি ট্রাকে যত পশু পরিবহন করার অনুমতি রয়েছে, তার চেয়ে বেশি পশু তোলা যাবে না। প্রতিটি পশুর শরীরের দুই পাশে অন্তত ১৫ সেন্টিমিটার এবং মাথা ও লেজের অংশে অন্তত ৩০ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে, যাতে পশুগুলো সহজে শ্বাস নিতে পারে এবং স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
এছাড়া পশু ওঠানোর আগে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। টানা ১০০ কিলোমিটার বা তিন ঘণ্টার বেশি পথ অতিক্রম করলে বাধ্যতামূলকভাবে বিরতি দিতে হবে। এই সময় পশুকে বিশ্রাম, পানি ও প্রয়োজনীয় যত্ন দিতে হবে। পশুবাহী যানবাহনের চালকের কাছে একটি তথ্য কার্ডও রাখতে হবে, যেখানে মালিকের নাম, ঠিকানা, পশুর সংখ্যা এবং গন্তব্যস্থলের তথ্য উল্লেখ থাকবে।
পশুর কষ্ট কমাতে আরও কিছু নির্দেশনা রয়েছে। ট্রাকে ওঠানো বা নামানোর সময় ঢালু পাটাতন ব্যবহার করতে হবে। পশুকে জোর করে লাফ দিতে বাধ্য করা বা টেনে-হিঁচড়ে নামানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ট্রাকের মেঝে এমন হতে হবে যাতে পশু পিছলে না যায়। বড় ধরনের ছিদ্র বা ভাঙা অংশ থাকলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে গণ্য হবে। একইসঙ্গে একই ট্রাকে ভিন্ন প্রজাতির পশু একসঙ্গে পরিবহন করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পশুকে অমানবিকভাবে পরিবহন করলে শুধু তাদের শারীরিক ক্ষতি হয় না, এতে মাংসের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত চাপ, পানিশূন্যতা ও আঘাতের কারণে পশু অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। ফলে জনস্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
আইন অনুযায়ী, পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণকে ‘অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রাণিকল্যাণ আইনের ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেন, তাহলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। একই অপরাধ পুনরায় করলে শাস্তির মাত্রা আরও বাড়বে। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
এদিকে ঈদকে সামনে রেখে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মাঠে তৎপরতা বাড়িয়েছে। বিভিন্ন পশুর হাট, মহাসড়ক ও পরিবহন কেন্দ্রগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ কিংবা পরিবহনে অনিয়মের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানি শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, এটি একটি মানবিক দায়িত্বও। তাই পশুর প্রতি সহানুভূতি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং আইন অনুসরণ করেই কোরবানি সম্পন্ন করা উচিত। এতে যেমন ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা পাবে, তেমনি নিশ্চিত হবে জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিকল্যাণও।