প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
এক সময় বড় পর্দায় নিজের খলচরিত্রে ভয় দেখানো সুরজিত সেন আজ কলকাতার ব্যারাকপুরে একটি মুদি দোকান চালাচ্ছেন। নায়ক দেবের সঙ্গে ‘হিরোগিরি’, ‘রংবাজ’, ‘চ্যালেঞ্জ ২’, ‘বিন্দাস’—এই জনপ্রিয় ছবিগুলোতে কাজ করে বাংলার সিনেমাপ্রেমীদের মনে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। তবে জীবনের বাস্তব মঞ্চে এখন তার লড়াই অনেকটা অন্যরকম।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে পর্দার বাইরে সুরজিত। জীবিকার জন্য এবার নির্ভর করতে হচ্ছে মুদির দোকানের আয়ের ওপর। ভারতীয় গণমাধ্যমকে তিনি জানান, ১৯৯৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অভিনয় করেও সব মিলিয়ে উপার্জন করেছেন মাত্র পাঁচ লাখ টাকা। তিনি বলেন, “ভাবুন, কী অবস্থা ছিল। অভিনয় দিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছি, কিন্তু আয় খুবই সীমিত ছিল।”
বর্তমানে তিনি ব্যারাকপুরে একটি ছোট মুদি দোকান চালান। দোকানে আইসক্রিম, পানীয়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করেন। এখান থেকেই চলে সংসার, এবং মা-বাবাও তার সঙ্গে থাকেন। তবে স্ত্রী সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন।
সুরজিতের মতে, রাজনীতির প্রভাবেই সিনেমায় কাজ পাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। অনেকে ভেবেছেন, আমি হয়তো অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু তা নয়। আমি কখনও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না।”
অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, “এখন আমার এই দোকানই ভরসা। এখান থেকেই সংসার চলে, এটাকেই ধরে রাখতে চাই।” দর্শক যাঁকে বড় পর্দায় খলচরিত্রে ভয় দেখাতে দেখেছেন, সেই সুরজিতের নতুন জীবন অনেকটাই সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।
সিনেমার জগৎ ছেড়ে এসে মুদি দোকান চালানোর এই গল্প শুধু সুরজিতের ব্যক্তিগত সংগ্রামের নয়, বরং চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে বেকারত্ব ও প্রতিযোগিতার বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে। বড় পর্দায় কাজ না পাওয়ার ফলে অনেক অভিনেতা কেবল জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় নিজেদেরকে খুঁজে নেন। সুরজিতের গল্প সেই বাস্তবতা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
তিনি বলেন, অভিনয়ের সময় তিনি পর্দায় শক্তিশালী, ভয়ঙ্কর চরিত্র হিসেবে অভিনয় করতেন। দর্শক তাকে ভয় পেত, কিন্তু বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন নরম হৃদয়ের মানুষ। কিন্তু সময় বদলেছে। বড় পর্দার জায়গা ছোট দোকানের মঞ্চে নেমেছে, যেখানে তিনি প্রতিদিন মানুষদের সঙ্গে বসে দৈনন্দিন জীবন চালান।
সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে তার অবদান এখনও ভোলেনি। দর্শকরা এখনও তাকে স্মরণ করেন ‘হিরোগিরি’ বা ‘রংবাজ’ সিনেমার খলচরিত্রের জন্য। তবে ব্যক্তিগত জীবনে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে হলে তাকে এখন এক নতুন মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করতে হচ্ছে—একটি সাধারণ মুদি দোকানের মাধ্যমে।
সুরজিতের জীবন দর্শকদের সামনে এক বাস্তব শিক্ষণীয় গল্পও তুলে ধরে। এটি প্রমাণ করে যে, জীবনের ওঠা-পড়া সব সময় পর্দার রঙিন জগতের মতো সহজ নয়। যেখানে একসময় নায়ক বা খলনায়ক হয়ে ভয় দেখানো যেত, সেখানে বাস্তব জীবনে টিকে থাকতে হলে নিয়মিত পরিশ্রম ও অধ্যবসায় অপরিহার্য।
অভিনয়ের পাশাপাশি অর্থ উপার্জনের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি আজ একটি সাধারণ পেশায় রয়েছেন। তবুও, সুরজিত সন্তুষ্ট, কারণ তার পরিবার ও জীবিকা সুরক্ষিত রয়েছে। তিনি মনে করেন, পর্দার খলচরিত্রের আড়ালে থাকা বাস্তব সংগ্রাম অনেক সময় আরও কঠিন এবং বেশি মন্থর।
সিনেমার জগতের চমকপ্রদ জীবন ছেড়ে আসা সুরজিতের নতুন অধ্যায় সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। তিনি এখন দিনের পর দিন গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন, জিনিসপত্র বিক্রি করেন, এবং সংসারের দৈনন্দিন দায়িত্ব পালন করেন। পর্দার ভয়ঙ্কর চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করলে এটি একেবারেই বিপরীত জীবনযাপন।
সুরজিতের এই গল্প শুধু একজন অভিনেতার জীবনযাত্রার পরিবর্তন নয়, এটি প্রমাণ করে যে, বাস্তব জীবনে টিকে থাকার লড়াই কখনও কখনও বড় পর্দার গ্ল্যামারের চেয়ে কঠিন। মানুষের জীবনে অর্থ, পরিচয় বা পরিচিতি সবই অস্থায়ী। টিকে থাকতে হলে, নতুন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।
সুরজিতের নতুন জীবন দর্শকদের কাছে একটি মানবিক বার্তাও দেয়—কঠিন সময়ে ধৈর্য, শ্রম ও বাস্তবতা মেনে চলাই জীবনের মূল চাবিকাঠি। তিনি মনে করেন, মুদির দোকানই এখন তার স্থায়ী মঞ্চ, যেখানে তিনি প্রতিদিন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এভাবে, খলনায়ক সুরজিতের জীবন একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, জীবনে কখনও কখনও বড় পর্দার খ্যাতি হারালেও মানুষের নিজস্ব অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং সচেতনতা জীবনের বাস্তব মঞ্চে টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য।