পাঁচ মামলায় জামিন পেলেন সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭৯ বার
পাঁচ মামলায় জামিন পেলেন সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ ছয় মাসের কারাবাস ও একাধিক মামলার জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে আইনি স্বস্তি পেলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। জুলাই মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানকালে পোশাক শ্রমিক মিনারুল হত্যাসহ মোট পাঁচটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন তিনি। রবিবার (৯ নভেম্বর) বিচারপতি এ এস এম আব্দুল মোবিন ও বিচারপতি সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশের আলোচিত এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় এসেছে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, জামিন আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছালে দ্রুতই মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এতে তার সমর্থক ও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে স্বস্তির হাওয়া বইছে।

সেলিনা হায়াৎ আইভী, যিনি একসময় নারায়ণগঞ্জের নাগরিক উন্নয়ন ও গণমানুষের রাজনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, গত ৯ মে রাতে শহরের দেওভোগ এলাকার নিজ বাড়ি চুনকাকুটির থেকে গ্রেফতার হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে মিনারুল হত্যাসহ কয়েকটি মামলার আসামি হিসেবে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ২৭ মে, ওই হত্যা মামলায় দুই দিনের রিমান্ড শেষে আইভীকে আবারও কারাগারে পাঠানো হয়।

এ ঘটনার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা মতভেদ দেখা গেলেও, সাধারণ জনগণের একাংশ মনে করেন আইভীকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করা হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারপক্ষ বলেছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইভীকে বিচারের মুখোমুখি করা ছাড়া বিকল্প ছিল না।

হাইকোর্টের এই জামিন আদেশের ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে—আইভী কি আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসবেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি সবসময়ই নিজের দৃঢ় অবস্থান, সাহসী বক্তব্য এবং নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তার জন্য পরিচিত ছিলেন। জামিন পাওয়ার পর যদি তিনি রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় হন, তবে নারায়ণগঞ্জ তথা জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে।

পোশাক শ্রমিক মিনারুল হত্যা মামলাটি মূলত জুলাই মাসের সেই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দায়ের করা হয়, যেখানে কয়েকজন শ্রমিক নিহত হন এবং অনেকেই আহত হন। তখন আন্দোলনের উত্তাপ নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আইভীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি নেপথ্যে থেকে ওই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছেন। যদিও আইভীর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ মহল এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

আইভীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম বলেন, “আমরা আদালতে প্রমাণ করেছি, আইভী কোনোভাবেই ওই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। এটি একটি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। আদালত আজ আমাদের যুক্তি গ্রহণ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন।”

জামিনের এই সিদ্ধান্তের পর নারায়ণগঞ্জ শহরে এক প্রকার উৎসবের আমেজ দেখা গেছে। চুনকাকুটিরের সামনে সকাল থেকেই স্থানীয় সমর্থকরা জড়ো হতে শুরু করেন। তারা ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান এবং “আইভী আপা মুক্তি পান” স্লোগান তুলেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে পোস্ট দেন এবং তাকে “নারায়ণগঞ্জের কণ্ঠস্বর” হিসেবে অভিহিত করেন।

তবে অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বলছেন, জামিন মানেই নির্দোষ প্রমাণ নয়। একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক হিসেবে আইভী যেন বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করতে পারেন, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। তারা মনে করছেন, তদন্তের সব প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা গেলে প্রকৃত সত্য প্রকাশ পাবে।

এদিকে হাইকোর্টের রায় ঘোষণার সময় আদালত কক্ষের পরিবেশ ছিল শান্ত ও স্বাভাবিক। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায় দেন। জামিনের আদেশ ঘোষণার পর আদালত কক্ষে উপস্থিত আইনজীবী ও সাংবাদিকদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়। অনেকেই মন্তব্য করেন, “এই রায় হয়তো আইভীর রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।”

সেলিনা হায়াৎ আইভী বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার এক পরিচিত নাম। তিনি দুইবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন এবং দেশের প্রথম নারী সিটি মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়েন। তার মেয়াদকালে শহরের উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে নানা উদ্যোগে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।

তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই তিনি রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন। সমর্থকদের দাবি, তার জনপ্রিয়তা ও স্বাধীন মনোভাব অনেকের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। তাই তাকে পরিকল্পিতভাবে নানা মামলায় জড়ানো হয়েছে। জামিনের পর তার আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, আইভী খুব শিগগিরই মুক্ত হয়ে আবারও জনসেবায় ফিরবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আইভী বাংলাদেশের নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। হাইকোর্টের এই রায় শুধু একজন রাজনীতিকের মুক্তি নয়, বরং এটি বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার প্রতিফলনও বয়ে আনে।

সবশেষে বলা যায়, সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিন পাওয়ার মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আবারও নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সমর্থকরা তার মুক্তির অপেক্ষায়, আর সমালোচকেরা তার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছেন। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এই নারী আবারও যদি মাঠে নামেন, তবে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি ফের পুরনো উত্তাপে ফিরবে—এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী জামিন কার্যকর হলে খুব শিগগিরই কারাগার থেকে মুক্ত হবেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। মুক্তির পর তিনি কি বলবেন, কী করবেন—তা এখন সারাদেশের রাজনীতিপ্রেমী মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। সময়ই বলে দেবে, এই জামিন তার জীবনে এক নতুন সূচনা নিয়ে আসে কিনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত