গণতন্ত্রের কঠিন সময়: ক্ষমতার খেলায় আমেরিকার দোলাচল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৯ বার
গণতন্ত্র ও ক্ষমতার লড়াইয়ের ফাঁদে মার্কিনিরা

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের প্রাচীনতম গণতন্ত্রগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র আজ নিজেই গণতন্ত্রের টেকসই অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের মুখে। দেশটির রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, ও নাগরিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রগুলোতে যে অস্থিরতা ও মেরুকরণ দেখা দিচ্ছে, তা কেবল নির্বাচনের প্রতিযোগিতা নয়—বরং গণতন্ত্র বনাম ক্ষমতার এক গভীর লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এই লড়াই এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গণতন্ত্রের মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় শক্তির সীমা স্পষ্টভাবে সংঘর্ষে লিপ্ত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানের মধ্য দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে এক নতুন রূপান্তর শুরু হয়। ট্রাম্প প্রচলিত রাজনীতির ধারার বাইরে থেকে এসে “জনতার কণ্ঠ” হিসেবে আবির্ভূত হলেও তার শাসনামলে প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ এবং স্বাধীন সংস্থাগুলোর ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি ক্ষমতায় থেকে এবং ক্ষমতার বাইরে গিয়েও মার্কিন রাজনীতিতে এমন একটি রীতির জন্ম দিয়েছেন, যেখানে ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা ক্রমে জোরদার হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। কেননা গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ—যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ ভূমিকায় স্বাধীনভাবে কাজ করবে। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নকারী সংস্থাগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমে বেড়েছে। আদালতের বিচারকদের ওপর দলীয় চাপ, সংবিধান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক আচরণ, এমনকি নির্বাচনী এলাকার পুনর্বিন্যাসের (গেরিম্যান্ডারিং) মতো পদক্ষেপগুলোও এই প্রবণতাকে বাড়িয়ে তুলছে।

গেরিম্যান্ডারিং এখন যুক্তরাষ্ট্রে এক নীরব রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলগুলো নিজেদের সুবিধামতো নির্বাচনী এলাকার সীমারেখা বদলে ফেলছে, যাতে বিরোধী দলের পক্ষে জয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে ভোটারদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে, যেখানে নির্বাচনের ফলাফল জনগণের ইচ্ছার চেয়ে রাজনৈতিক কৌশলের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

আরেকটি বড় সংকট হচ্ছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে বিচার বিভাগকে ক্ষমতার ভারসাম্যের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় একাধিক বিচারক নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়, তা এখনো দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব ফেলছে। বহু বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্তগুলো যদি দলীয় প্রভাবের ছায়ায় পড়ে, তবে সেটি গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে।

এই চিত্র কেবল শাসনব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের গভীর স্তরেও ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা এখন রাজনৈতিকভাবে এতটাই বিভক্ত যে, এক পক্ষ অন্য পক্ষকে প্রায় ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোও এই বিভাজনকে আরও উস্কে দিচ্ছে। সংবাদ ও মতামতের জায়গায় এখন দেখা যাচ্ছে ‘দলীয় ব্যাখ্যা’। ফলে সাধারণ মানুষ বাস্তবতার চেয়ে পক্ষীয় অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে গণতন্ত্রের সংকট কেবল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক প্রভাবও ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে গণতন্ত্রের রক্ষক ও প্রচারক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু যখন নিজ দেশের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নীতির ভাঙন দেখা দেয়, তখন সেই নৈতিক নেতৃত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এটি ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশেও প্রভাব ফেলছে, যেখানে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে গণতন্ত্রের পুনরুত্থানের নজিরও রয়েছে। গৃহযুদ্ধ, নাগরিক অধিকার আন্দোলন কিংবা নারী ভোটাধিকার আন্দোলন—সবই ছিল কঠিন সময়ের ফল, যেখানে জনগণের চেতনা আবারও গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও অনেক আমেরিকান নাগরিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও তরুণ কর্মী বিশ্বাস করেন—গণতন্ত্র এখনো বাঁচানো সম্ভব।

এই জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস ও নৈতিক দৃঢ়তা। ক্ষমতাকে সীমিত করা, আইনের শাসনকে পুনরুজ্জীবিত করা, সংবিধানকে আবারও সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসেবে মেনে নেওয়া—এই পথেই যুক্তরাষ্ট্র আবার তার গণতান্ত্রিক মর্যাদা ফিরে পেতে পারে। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিতে হবে।

গণতন্ত্রের শক্তি কখনোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকে থাকে না; তাকে রক্ষা করতে হয় প্রতিদিন, প্রতিটি প্রজন্মকে। আমেরিকার বর্তমান রাজনৈতিক সংকট হয়তো সেই চিরন্তন শিক্ষা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে—ক্ষমতা যত বড়ই হোক, তা কখনো জনগণের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করার জন্য নয়, বরং জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকার জন্যই প্রতিষ্ঠিত।

এখন দেখার বিষয়—আমেরিকা কি আবার তার গণতন্ত্রের মূল পথে ফিরবে, নাকি ক্ষমতার মোহে হারিয়ে ফেলবে সেই মহান ঐতিহ্য যা একসময় বিশ্বকে প্রেরণা জুগিয়েছিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত