প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা বিশ্বমঞ্চে এক নতুন পরিচয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। প্রাক্তন ‘জিহাদি যোদ্ধা’ থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিক হিসেবে রূপান্তরের প্রতীক হয়ে উঠেছে তার যুক্তরাষ্ট্র সফর। সোমবার তিনি হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। এটি সিরিয়ার কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম হোয়াইট হাউস সফর।
জানুয়ারিতে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করার পর থেকে আল-শারার এটি ২০তম বিদেশ সফর এবং যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় আগমন। এর আগে তিনি সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিয়েছিলেন। এই বৈঠককে কূটনৈতিকভাবে সবচেয়ে আলোচিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে মুখোমুখি হবেন প্রাক্তন মার্কিন প্রতিপক্ষ ও বর্তমান হোয়াইট হাউসের অধিপতি।
গত মে মাসে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যস্থতায় একটি বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আল-শারাকে “তরুণ ও আকর্ষণীয় নেতা” হিসেবে আখ্যা দেন এবং সিরিয়ার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের নির্দেশ দেন। তবে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়।
ওয়াশিংটনে আল-শারার মূল লক্ষ্য হল সিরিয়ার ওপর অবশিষ্ট নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ট্রাম্পকে রাজি করানো যেন ইসরায়েল সিরিয়ার ওপর হামলা বন্ধ করে এবং দক্ষিণ সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহার করে। তিনি এছাড়াও সিরিয়ার আন্তর্জাতিক একঘরেমি ভাঙার চেষ্টা করছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে আসাদ শাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে দেশটিকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে রাশিয়া ও ইরানের ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছিল।
রবিবার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে আল-শারা মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি প্রতীকী বাস্কেটবল খেলায় অংশ নেন। তবে দুই দশক আগে তিনি ছিলেন মার্কিন বাহিনীর প্রতিপক্ষ। ইরাকে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশ নেওয়া এই সাবেক যোদ্ধা বন্দিদশা শেষে মুক্তি পেয়ে ২০১১ সালে সিরিয়ায় ফিরে আল-কায়েদা-সমর্থিত একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী গঠন করেন।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর, গত বছর এক আকস্মিক সামরিক অভিযানে তিনি ৫৩ বছরের আসাদ রাজবংশের পতন ঘটান, যা কার্যত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটায়। আসাদ যুগে সিরিয়া ছিল মস্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্র। ১৯৭১ সালে হাফেজ আল-আসাদের আমলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তারতুসে নৌঘাঁটি স্থাপন করেছিল, যা আজও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। ২০১৫ সালে ভ্লাদিমির পুতিনের সামরিক হস্তক্ষেপ আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখলেও, সেই অভিযানে হাজারো সিরীয় প্রাণ হারায়।
গত মাসে আল-শারা মস্কো সফর করে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন, যদিও তিনি রাশিয়াকে শত্রু বানাতে চান না। এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া সিরিয়ার জন্য ব্যয়বহুল ও অযৌক্তিক হবে।”
একসময় যাকে সন্ত্রাসী হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সেই নেতা এখন বৈশ্বিক কূটনীতির নতুন মুখ। সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোও তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সহায়তা করছে, যা ইরান ও রাশিয়ার প্রভাব কমানোর দিকে নির্দেশিত।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এই পরিস্থিতি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে ঝুঁকি বহন করছে। প্রতিবেশী লেবানন ভেঙে পড়ছে, আর ইরাক এখনো ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে। ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক জোশুয়া ল্যান্ডিস মন্তব্য করেছেন, “ওয়াশিংটন আল-শারা ও সিরিয়ার ওপর একটি বড় জুয়া খেলছে। বিকল্পও সীমিত—লেবানন অস্থিতিশীল, আর ইরাক ইরানের প্রভাবাধীন।”
তবে নতুন এই নেতা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। সিএসআইএস-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক নাটাশা হল বলেন, “আল-শারার কূটনৈতিক অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে—নতুন যুগে কেউ একপক্ষীয়ভাবে জোটবদ্ধ নয়। পুতিনের সঙ্গে তার বৈঠক যেমন বাস্তববাদী, তেমনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তিনি নতুন সম্পর্কের পথ খুলছেন।”
আল-শারার আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রূপান্তর প্রমাণ করে, একসময়ের যোদ্ধা ও বিদ্রোহী এখন একটি নতুন সিরিয়ার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক খেলার গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে অবস্থান করছেন। তার কূটনীতিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সাহস বিশ্বমঞ্চে সিরিয়ার অবস্থান পুনর্নির্ধারণের দিকে এক নতুন অধ্যায় সূচিত করছে।