প্রিমিয়ার ব্যাংক ও কর্মকর্তাদের ৩.৪ কোটি টাকা জরিমানা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৩ বার
প্রিমিয়ার ব্যাংক ও কর্মকর্তাদের ৩.৪ কোটি টাকা জরিমানা

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের আর্থিক অঙ্গনে বড় ধরনের অডিট ও নিয়ন্ত্রণহীনতার ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যাংকটিতে প্রায় দুই যুগ ধরে কর্তৃত্ব বজায় রাখা এইচ বি এম ইকবাল ও তার পরিবারের অনিয়ম ও বৈদেশিক সম্পদ ক্রয় নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত তদন্তের পর বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মোট ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

বুধবার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর পাঠানো চিঠিতে বিএফআইইউ জানিয়েছে, আগামী রোববারের মধ্যে এই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। অন্যথায় ব্যাংকের হিসাব থেকে তা আদায় করা হবে। এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ‘অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন’ লঙ্ঘনের কারণে। তদন্তে দেখা গেছে, রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) হিসাব খোলা হয়েছে, তবে সেগুলোতে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ জমা হয়েছে এবং ঘোষিত ফরম সংরক্ষণ ও অন্যান্য বিধি যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। এছাড়া ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বৈদেশিক মুদ্রায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, যা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে অর্থপাচারের অভিযোগের সঙ্গে জড়িত। এই অভিযোগের কারণে ব্যাংকের বিরুদ্ধে এক কোটি ২০ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, পাঁচটি আরএফসিডি হিসাব এবং ১৮টি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন হলেও তা বিএফআইইউকে জানানো হয়নি। এছাড়া ব্যাংকের আরেক গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানিকারকের রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) হিসাব থেকে এক লাখ মার্কিন ডলার এইচ বি এম ইকবাল ও তার ছেলে মইন ইকবালের নামে স্থানান্তর করা হয়েছিল। ব্যাংককে এ ঘটনা ‘চুরি’ হিসেবে মূল্যায়ন করে এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়।

অপরদিকে, দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদেরও পৃথকভাবে জরিমানা করা হয়েছে। সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম রিয়াজুল করিমকে ৩০ লাখ, বর্তমান অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নওশের আলীকে ৩০ লাখ এবং ঢাকার বনানী শাখার তৎকালীন অপারেশন ম্যানেজার মনিরুল করিম লিটনকে ২২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ব্যাংকের কার্ড বিভাগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের প্রতি ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া ক্রেডিট কার্ড সীমা বাড়ানোর নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে জাকির হোসেন জিতুর ওপর ২২ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জরিমানার অর্থ তাদের কাছ থেকে আদায়যোগ্য হবে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক প্রশাসনকে আগেই বিএফআইইউ লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। তবে তদন্তে দেখা গেছে, ইকবাল ও তার পরিবারের চার সদস্যের অনিয়মের ঘটনা চলছেই। ইকবালের পরিবারের মধ্যে তিন সন্তান মোহাম্মদ ইমরান ইকবাল, মইন ইকবাল ও নওরীন ইকবাল এবং মইন ইকবালের স্ত্রী ইয়াসনা পূজা ইকবালও এ অনিয়মে জড়িত ছিলেন।

তদন্তে আরও প্রকাশিত হয়েছে যে, ইকবালসহ পাঁচজনের নামে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১৮টি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড এবং ৪টি প্রিপেইড কার্ড রয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তারা মোট ৩২,৫০,৩১১ মার্কিন ডলার খরচ করেছেন। এ সময় তারা বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন।

এই ঘটনা দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রণহীনতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা ও নিয়মবিরোধী কার্যক্রম দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা পুনরায় রোধ করতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষণ এবং কঠোর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য।

বিএফআইইউর এ কঠোর পদক্ষেপ শুধু প্রিমিয়ার ব্যাংককে সতর্ক করতে নয়, দেশের সকল ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থপাচার, সীমার্ধিক লেনদেন ও অনিয়মী ব্যবস্থাপনা রোধে এর চূড়ান্ত লক্ষ্য দেশের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সংক্ষেপে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের এই অনিয়ম ও তার অনুসরণে আরোপিত ৩.৪ কোটি টাকা জরিমানা দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক স্বচ্ছতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে অনিয়ম রোধের জন্য এটি একটি প্রতিরোধমূলক উদাহরণ হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত