প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সংবেদনশীল অধ্যায় আজ উন্মোচিত হতে চলেছে। জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজন আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার তারিখ আজ নির্ধারণ করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আজ সকাল থেকেই বিরাজ করছে তীব্র উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা এবং নানা জল্পনা-কল্পনা।
বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করবেন। মামলার অন্য দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
রায়ের দিন ঘোষণার বিষয়টি ঘিরে রাজধানী ঢাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নজিরবিহীনভাবে কঠোর করা হয়েছে। সকালে ট্রাইব্যুনাল ভবনের চারপাশে দেখা গেছে পুলিশ, র্যাব ও সেনা সদস্যদের টহল। প্রবেশপথে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। কোনো ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এর আগে, গত ২৩ অক্টোবর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মামলাটির শুনানি সম্পন্ন হয়। সেদিন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল জানায়, রায়ের তারিখ শিগগিরই ঘোষণা করা হবে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ বৃহস্পতিবার এ মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হচ্ছে।
মামলার অন্যতম আসামি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বর্তমানে কারাগারে আছেন। তিনি আদালতে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন, যা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেক আইনি বিশেষজ্ঞ। অপরদিকে, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্তমানে পলাতক। তাদের অনুপস্থিতিতেই ট্রাইব্যুনাল বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।
সূত্র জানায়, মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণের আগেই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সেনা সদর দফতরে একটি চিঠি পাঠায়, যাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর পর থেকেই সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। আদালতের প্রবেশপথে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।
রাজধানীতে এরই মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ এটিকে “ইতিহাসের ন্যায়বিচারের প্রতিফলন” হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকেই বলছেন এটি “রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ”।
আইনজীবী মহলের একটি অংশ বলছে, মামলার অভিযোগগুলো জটিল এবং সংবেদনশীল হওয়ায় রায়ের তারিখ নির্ধারণের পরও এটি নিয়ে আদালত ও দেশের জনগণের মধ্যে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হতে পারে। একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, “এটি শুধু একটি মামলার রায় নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করতে পারে।”
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক মহলের নজরও রয়েছে এই মামলার ওপর। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আজকের ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত ঘিরে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল আলোচনা। কেউ কেউ এদিনকে ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, রায়ের তারিখ নির্ধারণের পর পুরো রায় প্রকাশে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে আজকের সিদ্ধান্ত মামলার গতিপথকে নতুন মোড় দিতে পারে। আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত আইনজীবী ও সাংবাদিকদের মতে, ট্রাইব্যুনাল আজ শুধু রায়ের তারিখ ঘোষণা করবে না, বরং মামলার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিতে পারে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল এলাকার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হচ্ছে। সকাল থেকেই গণমাধ্যমকর্মীরা ট্রাইব্যুনালের সামনে অবস্থান করছেন। আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশের সময় সবাইকে কঠোর তল্লাশির মুখে পড়তে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রায়ের তারিখ ঘোষণার সময় শুধুমাত্র অনুমোদিত সাংবাদিক ও আইনি প্রতিনিধিরাই উপস্থিত থাকতে পারবেন।
দেশের জনমনে এখন একটিই প্রশ্ন—কবে এবং কেমন রায় আসছে শেখ হাসিনার মামলায়? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ রায় শুধু একটি ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য, আইনি কাঠামো ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে।
আজকের দিনটি তাই ইতিহাসের পাতা খুলে নতুন অধ্যায় লেখার দিন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রায়ের তারিখ ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হতে পারে দেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়—যার প্রতিধ্বনি পৌঁছাবে শুধু আদালতের চার দেয়ালের ভেতর নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মনে।