ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার রায় আজ, সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় আদালত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১২ বার
ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার রায় আজ, সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় আদালত

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আজ ঘোষিত হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করবে ট্রাইব্যুনাল। দীর্ঘ এক বছরের শুনানি ও যুক্তিতর্ক শেষে আজ বৃহস্পতিবার সকালে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মামলাটিকে তালিকার শীর্ষে রেখেছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার মধ্যেই গোটা রাজধানীজুড়ে এখন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে।

আজ ভোর থেকেই রাজধানীর কচুক্ষেতের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চত্বর পরিণত হয়েছে প্রায় এক ‘সামরিক জোনে’। আদালতের চারপাশে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। প্রত্যেক প্রবেশপথে বসানো হয়েছে মেটাল ডিটেক্টর ও ব্যারিকেড, প্রবেশের আগে তল্লাশি করা হচ্ছে সাংবাদিক, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষকে। আদালত ভবনের ছাদ থেকে শুরু করে আশপাশের ভবনেও মোতায়েন রয়েছে স্নাইপার দল ও পর্যবেক্ষণ টিম। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, “যেকোনো ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক আছি।”

নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আদালত এলাকায় আজ কার্যত সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে, কেবলমাত্র ট্রাইব্যুনালের অনুমোদিত সাংবাদিকরাই প্রবেশ করতে পারছেন। সাদা পোশাকে গোয়েন্দারা প্রতিটি মোড় ও পার্শ্ববর্তী গলিতে টহল দিচ্ছেন। সবকিছুই যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে, আজকের দিনটি দেশের ইতিহাসে এক সংবেদনশীল ও সম্ভাব্য মোড়-ঘোরানো মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে।

রায়ের দিন ঘিরে এমন নিরাপত্তা পূর্বে দেখা যায়নি, এমন মন্তব্য করেছেন আদালতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা জানান, বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুজব, হুমকি ও প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ছিল। এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাকর্মীরা দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার রায় নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় আছেন। অপরদিকে বিএনপি ও তাদের সমর্থক জোট বলছে, “এটি হবে ইতিহাসের জবাবদিহির দিন।”

মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনায় রয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ তাদের সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সেদিন আদালতে যুক্তি দেন যে, শেখ হাসিনা ও কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সংঘটিত অপরাধ মানবতাবিরোধী, এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে এর সর্বোচ্চ শাস্তি প্রাপ্য। তিনি উল্লেখ করেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতাসীন নেতারা মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারাধীন হয়েছেন; বাংলাদেশও সেই ইতিহাসের বাইরে নয়।”

রাষ্ট্রপক্ষের এ বক্তব্যের পর স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন পাল্টা যুক্তি দেন যে, মামলার সাক্ষ্য ও প্রমাণ অনেকাংশেই দুর্বল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাজানো। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত এই মামলা প্রকৃত বিচারের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়।” এরপর প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম পুনরায় জবাব দেন, যেখানে তিনি বলেন, “প্রমাণাদি ও সাক্ষ্যর ভিত্তিতে শেখ হাসিনা ও কামালের ভূমিকা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত।”

এ মামলার অন্যতম আলোচিত নাম সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন। তার সাক্ষ্যকে ঘিরে আদালতে সৃষ্টি হয়েছিল গভীর নাটকীয়তা। মামলার শেষ দিকে তার অবস্থান নিয়েও ব্যাপক জল্পনা ছড়ায়। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “মামুন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদালতের সামনে তুলে ধরেছেন, যা রায়ের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।” তবে তার আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ আদালতে যুক্তি দিয়েছেন, “তিনি কেবলমাত্র আদেশ পালন করেছেন, কোনো অপরাধে সরাসরি জড়িত ছিলেন না।” সেই যুক্তির প্রেক্ষিতে প্রসিকিউশন তার সাজা চাইলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনালের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

রাজধানীতে আজ সকাল থেকে রায়ের তারিখ ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ ও উৎকণ্ঠা দেখা যাচ্ছে। আদালতের বাইরে অনেকেই ভিড় করেছেন, তবে নিরাপত্তার কারণে কাউকে ট্রাইব্যুনাল চত্বরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় যানবাহন চলাচল সীমিত করা হয়েছে, কিছু এলাকায় বিকল্প রুটও নির্ধারণ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সকাল থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে নানা গুজব, তবে সরকার জানিয়েছে—‘অযাচিত তথ্য প্রচার’ রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আজকের রায় শুধু তিনজন আসামির ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতেও গভীর প্রভাব ফেলবে। মানবাধিকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, এ মামলার রায় “ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নতুন মাপকাঠি” তৈরি করবে কিনা, নাকি রাজনৈতিক প্রতিশোধের নতুন অধ্যায় শুরু করবে—তা সময়ই বলে দেবে।

দিনের প্রথম প্রহর থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও ট্রাইব্যুনাল সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। বিবিসি, আলজাজিরা, রয়টার্স, এনডিটিভিসহ বিভিন্ন বিদেশি সংবাদমাধ্যম এই মামলার ওপর নজর রাখছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি হতে পারে সবচেয়ে আলোচিত বিচারগুলোর একটি, যা শুধু বাংলাদেশের ভেতর নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

দেশের রাজনৈতিক মহলও নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে আজকের রায়ের জন্য। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বিচার ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ও আবেগ উভয়ই তীব্র। বিএনপি ও সমমনা জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “আজকের দিন হবে ন্যায়বিচারের পুনর্জন্মের দিন।” অন্যদিকে আওয়ামী লীগের একাংশ বলছে, “এই রায় হবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিচ্ছবি।”

দিনের শেষভাগে যখন ট্রাইব্যুনাল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে, তখন বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে যাবে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আপাতত আদালতের চারপাশে কেবল একটি শব্দই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—‘রায় আজ’।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত