প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) সম্প্রতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আজীবন সদস্যপদ অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করা হয়েছে। বুধবার (১২ নভেম্বর) ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় এই সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়, যা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সভা শেষে রাতের সংবাদ সম্মেলনে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্যপদ দেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে অবৈধ এবং ডাকসুর গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়েছিল। ২০১৯ সালে একটি রেজুলেশনের মাধ্যমে তাকে অগণতান্ত্রিকভাবে আজীবন সদস্যপদ দেওয়া হয়েছিল। আজকের সভায় সেই রেজুলেশনটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” তাঁর ভাষায়, ডাকসুর মূল উদ্দেশ্য হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যা মেনে চলা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, “যে কোনো সদস্যপদ বা সম্মান প্রদানের ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্রের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। ২০১৯ সালের রেজুলেশনটি সেই প্রক্রিয়া মানেনি। তাই আমরা তা বাতিল করেছি।”
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সভা অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফারেন্স রুমে। সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান। উপস্থিত ছিলেন ভিসি ছাড়াও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক, সহকারী সাধারণ সম্পাদক এবং কার্যনির্বাহী পরিষদের সকল সদস্য। বৈঠকটি পরিচালিত হয় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিয়ম মেনে। বিষয়টি নিয়ে শৃঙ্খলা ও সুসংগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
২০১৯ সালে ডাকসু থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্যপদ প্রদান করা হয়েছিল। ওই সময় ডাকসুর ভিপি ছিলেন নুরুল হক ও জিএস গোলাম রাব্বানী। সেই রেজুলেশনটি বিতর্কিত হলেও তখন কার্যকর হয়। শিক্ষার্থী এবং রাজনীতিবিদদের একাংশ বলেছিলেন, এটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ছাত্রসংসদের স্বতন্ত্র গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়েছিল। সেই প্রসঙ্গটি এবার পুনরায় উঠেছে, এবং বর্তমান কার্যনির্বাহী পরিষদ সেই রেজুলেশন বাতিল করার মাধ্যমে নিজেদের আইনগত দায়িত্ব পালন করেছে।
বাতিল ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। একাংশ শিক্ষার্থী বলছেন, এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং ডাকসু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে সম্মান ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, কিছু অংশের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক বিতর্কের আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধরনের সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সচেতনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডাকসুর এই পদক্ষেপ শিক্ষার্থী সংগঠন হিসেবে তাদের স্বকীয়তা ও স্বচ্ছতা প্রদর্শনের একটি স্পষ্ট সংকেত। তারা বলছেন, “ডাকসু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীবৃন্দের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেছে। এই ধরনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করছে যে কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রভাব বা জনপ্রিয়তার কারণে সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও গঠনতন্ত্রের মূলনীতি অগ্রাহ্য করা হবে না।”
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক মন্তব্য করেন, “আমরা চাই আমাদের সিদ্ধান্ত যেন শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষামূলক ও শিক্ষানুকূল হয়। এটি কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা রাজনৈতিক ইচ্ছার দ্বারা প্রভাবিত হয়নি। আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র সংবিধান ও গঠনতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও জানায়, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সকল আইনগত দিক বিবেচনা করা হয়েছে। সভার আয়োজন ও আলোচনার সময় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সমস্ত ধারা মেনে চলা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান বলেন, “ডাকসুর সিদ্ধান্ত গঠনমূলক এবং স্বচ্ছ। আমরা নিশ্চিত করেছি যে সভার সময় সকল দিক বিবেচনা করা হয়েছে এবং ছাত্রসংসদের গঠনতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য বজায় আছে।”
অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলেও এই বাতিল ঘোষণাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে, ছাত্রসংসদের এই পদক্ষেপ সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “যে কোনো সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে নেওয়া হলে তা স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতবিনিময়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।”
শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সিদ্ধান্তকে গণতান্ত্রিক শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এক শিক্ষার্থী বলেন, “ডাকসু আমাদের জন্য একটি মঞ্চ, যেখানে আমরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারি। এমন সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করবে।” অন্য এক শিক্ষার্থী যোগ করেন, “এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ। বিশেষ করে যখন এটি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদকে কেন্দ্র করে, তখন তা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ।”
বাতিল ঘোষণার পর পরবর্তী দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশে কিছু উত্তেজনা দেখা দিতে পারে, এমন আশঙ্কা থাকলেও ডাকসু নেতৃত্ব জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট থাকবে। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে মনোনিবেশ করবে এবং আলোচনাসভা ও বিতর্কের মাধ্যমে নিজেদের মত প্রকাশ করবে।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিক্ষার্থীদের স্বতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষার্থী রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার একটি নতুন অধ্যায় সূচিত করতে পারে।
সমস্ত দিক বিবেচনা করলে বলা যায়, ডাকসুর এই পদক্ষেপ শুধু একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও স্বচ্ছতার ধারণা প্রতিষ্ঠা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এই নতুন অধ্যায় দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রেরণাদায়ক হতে চলেছে, যেখানে স্বাধীন মত প্রকাশ ও গঠনতন্ত্রের প্রতি আনুগত্যই সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।










