প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নভেম্বর ২০২৫-এর পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই গণভোট হবে কি না, তা নিয়ে এখন বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জুলাই সনদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্যে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে নানা মতভেদ প্রকাশ পাচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য দল গণভোটকে জনগণের চূড়ান্ত ইচ্ছা যাচাইয়ের মাধ্যমে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে স্বীকার করেছে। তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কি নির্বাচনের আগে, নাকি নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে, তা নিয়েও রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
প্রাথমিক অবস্থায় বিএনপি গণভোটের আয়োজন নির্বাচনের পর করার কথা বললেও পরে নির্বাচনের দিন একযোগে সমাধা করার পক্ষে মত দিয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী জোটের সম্ভাব্য শরীকরাও একই মনোভাব প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে জামায়াতসহ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াধীন ইসলামি দলগুলো সাধারণ নির্বাচনের পূর্বেই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত যাচাই করতে চায়। এনসিপিও গণভোটকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে এবং সেটিকে নির্বাচনের আগে আয়োজনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তবে তারা নির্বাচনের দিন গণভোট করার বিষয়টি নিয়েও কিছুটা নমনীয়।
এখন দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের দিন গণভোট একযোগে আয়োজন করলে তা কার্যকারিতা হারাতে পারে। গণভোটের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো জনগণের চূড়ান্ত মতামত ও সিদ্ধান্ত জানার সুযোগ দেওয়া। একযোগে নির্বাচন ও গণভোট হলে জনগণ ঠিকভাবে ভোট বুঝতে বা তার প্রভাব মূল্যায়ন করতে সক্ষম নাও হতে পারে। এছাড়া খরচের বিষয়টিও একটি নিতান্ত খোঁড়া যুক্তি হিসেবে সমালোচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জনগণ গণভোটের গুরুত্ব বা পদ্ধতি বুঝতে পারবে কি না—এটি প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু।
বিএনপির বর্তমান অবস্থান, যা গণভোটকে পিছিয়ে রাখার পক্ষে, তার সঙ্গে দলের পূর্বের নীতিমালা ও ভিশন-২০৩০ এবং ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত কর্মসূচির সরাসরি বিরোধ তৈরি করছে। ২০১২-১৩ সালে প্রস্তুত গবেষণাপত্রে বেগম খালেদা জিয়াকে দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক, রাজনৈতিক, জাতীয় সংসদ, নির্বাচন ও সরকার পরিচালনার সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জনগণের জন্য গণভোটের মাধ্যমে উন্মুক্ত করার প্রস্তাব। বিএনপি সেটি গ্রহণ করে ভিশন-২০৩০-এর গণতন্ত্র অংশের ৭ এবং ৮ নম্বর ধারায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “বিএনপি সংবিধানে গণভোটব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃস্থাপন করবে।”
২০১৪-১৫ থেকে ২০১৬-১৭ সালের মধ্যে বিএনপির কমপক্ষে ৩০ জন শীর্ষ নেতা এই নীতিমালা বোঝার সুযোগ পেয়েছিলেন। স্ট্যান্ডিং কমিটির একটি সিনিয়র সদস্য তা থেকে ২৭টি মূল পয়েন্ট তৈরি করেন, যা পরে ৩১ দফা কর্মসূচিতে রূপ নেন। এই সময় নৈতিকতা, ইসলাম ও মুসলিম বিষয়গুলি বাদ রাখা হয়, কিন্তু গণভোটের নীতিমালা সর্বাধিক গুরুত্ব পায়।
গণভোটের ধারণা রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করেছিলেন জনমত যাচাইয়ের জন্য। ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি সংবিধানে গণভোটের প্রভিশন না থাকা সত্ত্বেও দুটি প্রেসিডেনশিয়াল প্রক্লেমেশনের মাধ্যমে সংবিধানে ব্যাপক সংশোধন কার্যকর করেন। ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল এবং ২৭ নভেম্বরের প্রক্লেমেশন অর্ডারের মাধ্যমে সংবিধানের মূল অনুচ্ছেদগুলো পরিবর্তন ও সংশোধন করা হয়। সংবিধানের সংশোধনগুলো পরে ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনের মাধ্যমে র্যাটিফাই করা হয়। জিয়ার এই পদক্ষেপ দেশের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি রাষ্ট্রের জনমালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার লিখিত অঙ্গীকার করেও এখন গণভোটকে পিছিয়ে দিতে চাচ্ছে। তারা রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার আদর্শ থেকে সরে গিয়ে কেবল নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট করতে চাইছে। কিন্তু এ অবস্থায় জনগণ পূর্বাহ্ণে তাদের ইচ্ছা ও ম্যান্ডেট প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে না। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামতকে সর্বাধিক গুরুত্ব না দিলে গণতন্ত্রের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গণভোটকে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে আয়োজন করা হলে জনগণ তাদের মতামত জানাতে পারে এবং তা দেশের স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অবদান রাখবে। তা না হলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কেবল একটি সীমিত দলীয় ও প্রতিনিধি এলিটের হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে। সাধারণ মানুষ, যারা আন্দোলন, সংগ্রাম ও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় অংশ নিয়েছে, তারা এই প্রক্রিয়ায় নিরব থাকবে না।
বর্তমান রাজনৈতিক নেতারা গণভোট বুঝে না বা জনগণ তা বোঝে না বলে দাবি করছেন। কিন্তু বাস্তবে গণভোট জনগণের স্বতন্ত্র মত প্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম বৈধ মাধ্যম। রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে, দেশের মানুষ এখনও স্বাধীনভাবে তাদের মত প্রকাশের অধিকার ফিরে পেতে চায়। এটি শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক চুক্তির অংশ, যা জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
গণভোট দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এটি জনঐক্য ও সমষ্টি ইচ্ছা প্রতিষ্ঠা করে, আধিপত্যবাদ রুখে দেয়, মানবিক মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তোলে। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও নবনির্মাণে এটি একমাত্র কার্যকর উপায়। জনগণকে পুনঃস্বক্রিয় হয়ে তাদের অধিকার, স্বাধীনতা ও কার্যকর নাগরিক সত্তা নিশ্চিত করতে হবে, এবং জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই গণভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নিতে হবে। গণভোট এখন শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি দেশের জনমালিকানা ফিরিয়ে আনার, রাষ্ট্রকে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক করার, এবং জনগণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানার একমাত্র বৈধ উপায়।