যশোরে শীতের বাজারে সবজি-মাছের দাম আকাশছোঁয়া, ভোক্তাদের হতাশা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৭ বার
পেঁয়াজ-মরিচ কমলেও সবজির দাম এখনও চড়া

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যশোরে শীতের আমেজ শুরু হলেও বাজারের দাম ক্রেতাদের মুখে হতাশার ছাপ ফেলে দিয়েছে। শীতকালীন সবজি থেকে শুরু করে মাছ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের দৈনন্দিন ব্যয়-ভার আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) যশোরের বড়বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বিভিন্ন কারণে দাম তীব্রভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বৃষ্টিপাতের কারণে ক্ষেতগুলোতে ক্ষতি হওয়ায় শীতকালীন সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাইকারি সবজি বিক্রেতা আবদুল লতিফ জানান, “আগাম শীতকালীন সবজি কয়েক সপ্তাহ ধরে বাজারে আছে। কিছুদিন আগে দাম কমতেও শুরু করেছিল। কিন্তু গত সপ্তাহের বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বাড়তে বাধ্য হয়েছে।” খুচরা বিক্রেতা ফরহাদ আলী বলেন, “পাইকারিতে দাম বেশি থাকায় খুচরায়ও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারের সার্বিক অস্থিরতার কারণে সবজির দাম এখনও স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে পারছে না।”

বাজারে ক্রেতাদের দুঃখ প্রকাশ স্পষ্ট। জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ক্রেতা বলেন, “শীত মৌসুমের শুরুতে সবজির দাম সাধারণত হাতের নাগালে থাকে। কিন্তু এই বছর পুরো পরিস্থিতি ভিন্ন। দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। আয়-ব্যায়ের হিসাব মেলানো দিনদিন কঠিন হয়ে পড়ছে।”

বাজারে পাওয়া শীতকালীন সবজির মধ্যে পাতাকপি কেজিতে ৫০ টাকা, ফুলকপি ৭০ টাকা, শিম ১০০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা, টমেটো ১৪০ টাকা, মুলা ৩০ টাকা, ধনেপাতা ৩০০ টাকা, কচু ৫০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৬০ টাকা, কচুরমুখী ৪০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১৪০ টাকা, গাজর ৬০ টাকা, শসা ৮০ টাকা, আলু ২৫ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, পটোল ৩০ টাকা, উচ্ছে ৬০ টাকা, পুঁই শাক ৩০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাউ প্রতি পিস ৩০-৪০ টাকা, পালং শাক প্রতি আঁটি ২৫ টাকা, লাল শাক ১৫ টাকা এবং লেবু ২০ টাকায় ক্রেতাদের হাতে যাচ্ছে।

মাছের বাজারেও দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রভাব পড়েছে। আব্দুল মতিন নামের এক বিক্রেতা বলেন, “বাজারে মাছের সরবরাহ কম। তাই গত কয়েক মাস ধরে দাম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। সহসা দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই।” অপর মাছ বিক্রেতা নজরুল ইসলাম বলেন, “শীত শুরু হওয়ায় মাছ ধরার পরিমাণ কমে গেছে। সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বেড়েছে এবং এটি ক্রেতাদের ওপর চাপ তৈরি করছে।”

বাজারে প্রতি কেজি পাবদা ৩৮০ টাকা, শিং ৪৪০ টাকা, পাঙাশ ১৮০ টাকা, রুই ২৬০ থেকে ৩৭০ টাকা, সিলভার কার্প ১৬০ থেকে ২০০ টাকা এবং তেলাপিয়া ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ছোট চিংড়ি ৬০০ টাকা, বড় চিংড়ি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, কৈ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, চিতল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, বোয়াল ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা এবং আইড় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ১৪০০ টাকায়। চন্দনা ইলিশ ৩০০ টাকা, বড় কাতলা ৪৫০ টাকা, ভেটকি ৬৫০ টাকা, সামুদ্রিক পোমা ৪০০ টাকা, টুনা ৪০০ টাকা এবং ভাঙ্গুর ৬৮০ টাকা দরে ক্রেতাদের হাতে যাচ্ছে। দেশি পুঁটি, টাকি, বাইনসহ বিভিন্ন ছোট মাছ ৪০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মুরগি ও মাংসের বাজারেও ভোক্তারা সতর্ক। কক মুরগি কেজিপ্রতি ২৫০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৮০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, গরুর মাংস ৭৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চালের বাজারেও সামান্য পরিবর্তন, মিনিকেট চাল ৮০ থেকে ৯০ টাকা, বাংলামতি ৮০ টাকা, চিনিগুঁড়া ১৫০ টাকা, নাজিরশাইল ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডালেও দাম বাড়ছে; দেশি মসুর ডাল কেজিপ্রতি ১২২ থেকে ১২৫ টাকা, আমদানি করা ডাল ১২৫ থেকে ১৩০ টাকায় ক্রেতাদের হাতে যাচ্ছে।

সাধারণ ভোক্তারা সরকারের বাজার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করার দাবি তুলেছেন। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “সবকিছুর দাম যেন একসঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী। ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার চাপই সাধারণ ক্রেতাদের ওপর পড়ছে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং হলে মানুষের কিছুটা হলেও স্বস্তি পেত।” হাবিবুর রহমান নামের এক ক্রেতা বলেন, “শোনা যায় প্রশাসন বাজার মনিটরিং করে। কিন্তু কখনো নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাইনি। বাজারে কার্যকর মনিটরিং না থাকলে দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। সরকারের উচিত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং প্রকৃত অর্থে জোরদার করা এবং কৃষকের বাজার গড়ে তোলা, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তি পায়।”

যশোরের বাজারে এ চিত্র স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, শীতের মৌসুম শুরু হলেও মাছ ও সবজির দাম ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ যেন প্রতিদিনই নতুনভাবে চিন্তার মুখে পড়ছে। বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরবরাহ বাড়ানো, মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা এবং পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন একান্ত প্রয়োজন।

এ পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দিক থেকেও প্রভাব ফেলছে। স্বল্পবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রেতারা দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন। শীতকালীন পুষ্টিকর সবজি ও মাছ ক্রয়ের ব্যয় বাড়ার ফলে পরিবারের খাদ্যাভ্যাসের মানও প্রভাবিত হচ্ছে। বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী চাপের মাঝেও ডিম এবং কিছু ধরনের মুরগির দাম সামান্য স্থিতিশীল থাকায় ক্রেতাদের কিছুটা স্বস্তি মিলছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল করতে হলে ক্রমাগত মনিটরিং, সরবরাহ বৃদ্ধি ও দায়িত্বশীল ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত