নির্বাচন স্বচ্ছ করুন: প্রশাসনের উদ্দেশে জামায়াত সেক্রেটারি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৪ বার
নির্বাচন স্বচ্ছ করুন: প্রশাসনের উদ্দেশে জামায়াত সেক্রেটারি

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

খুলনার সকালের আকাশে সূর্য তখনও পুরোপুরি ওঠেনি, কিন্তু শহরের রাজপথ ইতোমধ্যে সরব হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারিতে। হাজারো তরুণ, স্থানীয় মানুষ ও দলের সমর্থকের অংশগ্রহণে খুলনার জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু হওয়া এক বিশাল মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা যেন নির্বাচনী উত্তাপকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই শোভাযাত্রার উদ্বোধনী পথসভায় দাঁড়িয়েই জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রশাসনের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানান—“আপনারা নিরপেক্ষ থাকুন, আগামী নির্বাচন স্বচ্ছ করুন।”

তার বক্তব্যে শোনা যায় আগামীর জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বহু মানুষের উদ্বেগ, সংশয় এবং আশার মিশেল। তিনি বলেন, অতীতের নির্বাচনগুলো, বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন, জাতির মনোজগতে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এমন নির্বাচন আর হলে দেশের ভাগ্যে চরম দুর্ভোগ নেমে আসবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, জনঅসন্তোষ ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের যে ছাপ পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, তা যেন আবার ফিরে না আসে—এই সতর্কতাই ছিল তার কথার মূল সুর।

পথসভায় দাঁড়িয়ে তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানান নিরপেক্ষ থেকে নির্বাচন পরিচালনা করার। তার বক্তব্যে উঠে আসে অতীতের কিছু ঘটনার উল্লেখ, যেখানে তিনি দাবি করেন—যারা প্রশাসনের দায়িত্বে থেকে কোনো বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই পরে আইনগত জটিলতায় পড়েছেন, ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দিচ্ছেন কিংবা দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, “অনেক ওসি-এসপি চাকরি ছেড়ে পালিয়েছেন, কেউ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেছেন। এমনকি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও নিরাপদ নন।” তার যুক্তি ছিল, রাষ্ট্রের দায়িত্বে যারা জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার বদলে দলীয় স্বার্থের প্রয়োজনে কাজ করেন, ইতিহাস তাদের কখনো ক্ষমা করে না।

মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষণে ছিল নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি বলেন, “প্রত্যেক প্রার্থী যেন সমান সুযোগ পায়, কেউ যেন ভয়-ভীতি বা অন্য কোনো চাপের মুখে নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে সরে না দাঁড়ায়—এটাই এখন সময়ের দাবি।” প্রশাসনের প্রতি তার এই আহ্বান মূলত ভোটারদের অধিকার ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার আহ্বান বলেই মনে হয়।

এরপর তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনকে কালো টাকার প্রভাবমুক্ত করতে হবে। তিনি দাবি করেন, অতীতে যারা ঘের দখল করেছে, মন্দির ভেঙেছে কিংবা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের বিরুদ্ধেই এখন জনতার ক্ষোভ জমা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের মানুষ শপথ নিয়েছে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দেওয়ার, কারণ তারা শান্তিতে বসবাস করতে চায়, নতুন দেশের স্বপ্ন দেখতে চায়, এবং অতীতের অত্যাচার-অন্যায় থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।

তার বক্তব্যে রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেন, “৫৪ বছরে আমরা নৌকা, লাঙ্গল, ধানের শীষসহ বহু মার্কা দেখেছি। প্রতিটি শাসনেই দুর্নীতি হয়েছে, লুটপাট হয়েছে, মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়নি। এসব দেখে মানুষ এখন পরিবর্তন চায়।” এর সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন ইসলামী রাজনীতির ব্যাখ্যা—“মানব রচিত বিধান দিয়ে দেশ পরিচালনা করতে গেলে শান্তি আসে না, এটি বহুবার প্রমাণিত।” তার আহ্বান, আগামীতে কুরআনের নির্দেশনাভিত্তিক একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতি।

খুলনার জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রা ক্রমশ ফুলে-ফেঁপে ওঠে। পাঁচ হাজারেরও বেশি মোটরসাইকেল নিয়ে বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে শোভাযাত্রাটি উৎসবমুখর এক পরিবেশ সৃষ্টি করে। গুটুদিয়া, ডুমুরিয়া, খর্ণিয়া, চুকনগর, আঠারোমাইল, রুদাঘরা, রঘুনাথপুর, শাহপুর, ধামালিয়া, জামিরা, ফুলতলা, দামোদর হয়ে শিরোমনি শহীদ মিনার চত্বরে গিয়ে শেষ হয় শোভাযাত্রা। প্রতিটি এলাকায় জনগণ রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে শোভাযাত্রাকে স্বাগত জানায়। বিশেষ করে তরুণদের উপস্থিতি নজরকাড়া ছিল। মিয়া গোলাম পরওয়ারও জাতীয় পতাকা হাতে জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা জানান।

এ যেন শুধু শোভাযাত্রা ছিল না; এটি ছিল এক জনমত গঠনের প্রচেষ্টা, মানুষের আবেগ-উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ এবং আগামীর নতুন বাংলাদেশের প্রতি এক ধরণের প্রত্যাশা। পুরো পথজুড়ে দাঁড়িপাল্লা মার্কার স্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত হয়ে ওঠে, যা দলটির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে।

পথসভা শেষে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। সব দলকে মানুষ দেখেছে, এখন তারা শান্তির, ন্যায় ও মর্যাদার সমাজ চায়। তাই তারা দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।” তার ভাষণে মানুষের প্রতি আস্থা, পরিবর্তনের প্রতি আশা এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন হরিণটানা থানা আমির জি এম আব্দুল গফুর। বক্তব্য রাখেন খুলনা-১ আসনের প্রার্থী মাওলানা শেখ মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম, অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, গাউসুল আযম হাদীসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধিরা। তাদের বক্তব্যেও উঠে আসে নির্বাচনকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার আহ্বান, শান্তির বাংলাদেশ গড়া এবং দুর্নীতিমুক্ত নির্বাচনের দাবি।

শেষদিকে মিয়া গোলাম পরওয়ার স্পষ্টভাবে বলেন, যারা ১০০ কোটি টাকা নিয়ে নমিনেশন এনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য কখনোই সৎ হতে পারে না। তারা নির্বাচিত হলে দেশে নতুন ধরনের দুর্নীতির বিস্তার ঘটবে। এমন প্রার্থীদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা মানে জাতিকে পিছিয়ে দেওয়া। তাই সৎ, যোগ্য ও চরিত্রবান প্রার্থীদের বিজয়ী করার মধ্য দিয়েই দেশকে বদলে দেওয়া সম্ভব।

খুলনার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এই শোভাযাত্রা ও পথসভা প্রমাণ করে মানুষ রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছে, এবং এই পরিবর্তন যে কেবল দলীয় নয়, বরং দেশের ভবিষ্যতের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত—তা স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠে। প্রশাসনের প্রতি তার আহ্বান তাই শুধু দলের স্বার্থে নয়, বরং রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র রক্ষার বৃহৎ স্বার্থে, যাতে আগামী নির্বাচন হয় স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত