প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ভয়াবহ সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় আজ সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ ঘোষণা হতে যাচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি এক বিশেষ মুহূর্ত, কারণ গণহত্যার দায়ে সরকারের সর্বোচ্চ পদধারী একজন ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক বিচার কাঠামোর মাধ্যমে বিচারাধীন আনা হচ্ছে। এই মামলা শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক এবং বিশ্বমঞ্চেরও নজর কাড়ছে।
মামলার প্রধান আসামি শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এই পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে রয়েছে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদকে হত্যার ঘটনা, রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় জন আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা।
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান পলাতক। জানা যায়, তারা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনই এই মামলার একমাত্র গ্রেফতারকৃত আসামি। তিনজনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এই মামলা দেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য পরিচালিত প্রথম বিচার।
আজকের রায়ের জন্য ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ভোর থেকেই ট্রাইব্যুনাল সংলগ্ন প্রধান সড়কে সেনা মোতায়েন করতে দেখা যায়। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে সেনাসদরে বিশেষ চিঠি পাঠানো হয়েছে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য। রায় ঘোষণার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সতর্ক অবস্থায় থাকবেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ আজ রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার অফিস জানিয়েছে, আজ সকাল ১১টায় বিচার কার্যক্রম শুরু হবে।
রোববার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, এই মামলার পাঁচটি অভিযোগ তারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ট্রাইব্যুনাল যে আদেশই দেন না কেন, প্রসিকিউশন তা মেনে নেবে এবং ন্যায্য বিচার সম্পন্ন হবে। প্রসিকিউটর তামীম জানান, আজকের রায় ট্রাইব্যুনাল থেকে পড়া অংশ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন লাইভ সম্প্রচার করবে, আর দেশের অন্যান্য গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের মাধ্যমে এটি লাইভ দেখতে পারবে। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও সম্প্রচার করা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারির জন্য আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলে আবেদন করেছে। প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন জানিয়েছেন, রায়ে যদি ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে শাস্তি প্রদান করেন, তাহলে ইন্টারপোলে কনভিকশন ওয়ারেন্ট জারি করার জন্য আবেদন করা হবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা হবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার মূল অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন চলাকালে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র দমনপীড়নের নির্দেশ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের সব বাহিনী, তার দল আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনগুলোকে বিশেষ করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগকে ব্যবহার করে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এই হামলায় দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন, চোখ হারিয়েছেন, আরেকাংশ জীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগের মধ্যে আছে, ১৪ জুলাই ২০২৪ সালের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ হিসেবে উল্লেখ করে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র রাজনৈতিক ক্যাডারদের নির্দেশ দেন, যাতে তারা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে হত্যা ও ভীতিকর হামলা চালায়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ কার্যকর করেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তৃতীয় অভিযোগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে হত্যার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। চতুর্থ অভিযোগে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জন আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা এবং শেষ অভিযোগে আশুলিয়ায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া ঘটনা রয়েছে। এ ঘটনার মধ্যে একজনও জীবিত ছিলেন, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের মাত্রা আরও বেড়ে দেয়।
আজকের রায় শুধু আদালতের সিদ্ধান্ত নয়, এটি দেশের ইতিহাসে ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নিহতদের পরিবার, আহতরা এবং সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করেছেন। যারা তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, তারা রায়ের মাধ্যমে অন্তত কিছুটা ন্যায়বিচারের স্বাদ পাবেন। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হবে, যাতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও গণহত্যার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া না হয়।
আজকের রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি কেবল তিনজনের বিচার নয়, বরং নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের জন্য ন্যায়বিচার, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সততা ও মানবাধিকারের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। আজকের রায়ের প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হবে।